বাংলাদেশ ব্যাংক–এর গভর্নর পদ থেকে বিদায় নিয়েছেন ড. আহসান এইচ মনসুর। দেড় বছরের দায়িত্বকালে ব্যাংকিং খাতে শুদ্ধি অভিযানের ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় এলেও শেষ পর্যন্ত তার বিদায় ঘিরে উঠেছে নানা বিতর্ক, সমালোচনা ও গুরুতর অভিযোগ।
দায়িত্ব নেওয়ার পর শিল্পগোষ্ঠী, ব্যাংকিং খাত ও প্রভাবশালী পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে ১১টি যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমানভাবে বড় কোনো অর্থপাচার বা দুর্নীতির প্রমাণ সামনে আসেনি।
সমালোচকদের মতে, কঠোর নজরদারি ও অনিশ্চয়তার আবহে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে, পুঁজিবাজারে স্থবিরতা এসেছে এবং বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো নতুন বিনিয়োগে অনীহা দেখিয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে দাবি ওঠে, ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর দুবাইয়ের আল জাদ্দাফ এলাকায় প্রায় ১৩.৫ মিলিয়ন দিরহাম মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট গভর্নরের মেয়ের নামে কেনা হয়েছে। অভিযোগে অর্থপাচারের কথাও বলা হয়। তবে গভর্নর দাবি করেন, সম্পত্তিটির সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং অভিযোগটি ভিত্তিহীন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৪ মাসে ১৪ বার বিদেশ সফরে গিয়ে প্রায় ১০০ দিন দেশের বাইরে কাটানোর তথ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ব্যাংকারদের একটি অংশ মনে করেন, সংকটকালে এত ঘন বিদেশ সফর পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ফলে ব্যাংকঋণের সুদ ১৬ শতাংশের ঘরে পৌঁছে যায়। শিল্প ও ব্যবসা খাতে ঋণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগ কমে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এত কড়াকড়ির পরও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিতভাবে না কমায় নীতির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একাংশের অভিযোগ, গভর্নর দপ্তর থেকে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)–এর ফ্রিজকৃত হিসাবসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত চাওয়া হতো। অভিযোগ আছে, স্পর্শকাতর তথ্য একটি সিন্ডিকেটের কাছে পাচার করে ফ্রিজ হিসাব সচল করার তদবিরের মাধ্যমে অর্থ আদায় করা হয়েছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে আনুষ্ঠানিক প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
সরকারি ব্যয়সংকোচন নীতি উপেক্ষা করে প্রায় দুই কোটি টাকার বেশি মূল্যের একটি বিলাসবহুল গাড়ি কেনার অভিযোগও উঠেছে। দাবি করা হয়েছে, যথাযথ দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি এবং এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদিত যানবাহন তালিকায় ছিল না।
দায়িত্বকালে একাধিক ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন, খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ, ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে পুনঃতফসিল সুবিধা, ব্যাংক পর্ষদ পুনর্গঠনসহ নানা পদক্ষেপ নেন তিনি। তবে সমালোচকরা বলছেন, এসব উদ্যোগের ফলে খাতে স্থিতিশীলতার বদলে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
