নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের মানবাধিকার ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক চরম উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) মে মাসের সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত মে মাসে দেশে অন্তত ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। একই সময়ে ‘মব জাস্টিস’ বা ৬৬টি গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন। এছাড়া গত মাসে ৮৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাঁদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়সই ১৮ বছরের নিচে।
গতকাল শুক্রবার (৫ জুন, ২০২৬) এইচআরএসএস-এর পক্ষ থেকে মে মাসের এই মানবাধিকার প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। দেশের বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং সংগঠনের নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
৬৬টি গণপিটুনি ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে দেশে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির তীব্রতা ছিল ভয়াবহ। ৬৬টি গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ফরিদপুরে স্রেফ গুজব ছড়িয়ে এক যুবককে এবং গাজীপুরে চুরির অভিযোগে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া চুয়াডাঙ্গায় এক যুবককে নির্মম নির্যাতনের পর গায়ে গরম পানি ঢেলে হত্যার নৃশংস ঘটনাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
পাশাপাশি সুন্দরবনে বন বিভাগের কর্মীদের গুলিতে এক নিরীহ জেলে এবং জামালপুরে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় নদীতে ঝাঁপ দিয়ে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনাকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছে এইচআরএসএস। এছাড়া গত মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ২৮টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনটি।
রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৫
এইচআরএসএসের তথ্যমতে, মে মাসে সারা দেশে অন্তত ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ৫ জন নিহত এবং অন্তত ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নিহতদের মধ্যে বিএনপির একজন, জামায়াতের একজন, পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) দুজন এবং একজন সাধারণ নারী রয়েছেন।
সংগঠনটির মতে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলই ছিল এসব সহিংসতার প্রধান কারণ। গত এপ্রিল মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা সংখ্যায় বেশি (৯৮টি) থাকলেও, মে মাসে এসে প্রাণহানির ঘটনা ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
৮৩ নারী ও শিশু ধর্ষণ, ৪ শিশুকে হত্যার ভয়াবহ চিত্র
মে মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের এক লোমহর্ষক পরিসংখ্যান দিয়েছে এইচআরএসএস। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মাসে অন্তত ৩০৫ জন নারী ও শিশু বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৮৩ জন ধর্ষণের শিকার হন, যার ৭০ শতাংশেরই বয়স ১৮ বছরের নিচে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, ধর্ষণের পর ৬ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ৪ জনই অবুঝ শিশু। এছাড়া গত মাসে ৭৬ জন নারী ও কন্যাশিশু তীব্র যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৪২ জনই ছিল শিশু।
মানবাধিকার পরিস্থিতির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংগঠনটি জানায়, গত তিন মাসে হামের উপসর্গ ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে সারা দেশে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি গত ২৭ মে রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক দিনে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সীমান্ত হত্যা ও ১,৯৩৫ জন গ্রেফতার
প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় ৪ জন বাংলাদেশি নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন, যাদের ৩ জন সরাসরি গুলিবিদ্ধ। একই সময়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে ৩ জন স্থানীয় সাধারণ নাগরিক নিহত হন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের তথ্যে বলা হয়, মে মাসে বিভিন্ন ঘটনায় সারা দেশে অন্তত ১ হাজার ৯৩৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
গণমাধ্যমের টুঁটি চিপে ধরা সাংবাদিক নির্যাতন
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে এইচআরএসএস জানায়, মে মাসে ৩9টি পৃথক ঘটনায় অন্তত ৭৮ জন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪২ জন আহত, ১৮ জন লাঞ্ছিত এবং ৯ জন সরাসরি হুমকি পেয়েছেন। খাগড়াছড়িতে পুরোনো মামলায় এক সাংবাদিককে গ্রেফতার এবং চট্টগ্রামে শিশু ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় লোকজনের অবরোধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ছোড়া গুলিতে দুই সাংবাদিক আহত হওয়ার বিষয়টিকেও প্রতিবেদনে কালো অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে দায়ের করা ৫টি মামলায় নতুন করে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের শেষাংশে এইচআরএসএস জোর দিয়ে বলেছে, দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও মানবিক অগ্রগতির স্বার্থে একটি শতভাগ জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।