দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ আবারও অত্যন্ত উদ্বেগজনক হারে বাড়তে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এডিস মশাবাহিত এই রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে ১০১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর এক দিনে হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্যামিতিক হারে রোগী বাড়লেও ডেঙ্গু প্রতিরোধ ব্যবস্থার পুরনো ও কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো এখনো কাটিয়ে ওঠা যায়নি। দীর্ঘ দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে এডিস মশার কোনো ‘জাতীয় জরিপ’ না হওয়া, দেশের সিটি করপোরেশনগুলোতে তীব্র কীটতত্ত্ববিদ সংকট এবং মাঠপর্যায়ের নজরদারির অভাব বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এখনই বৈজ্ঞানিক উপায়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তাঁরা।
পরিসংখ্যানে ডেঙ্গুর চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ৩০৩ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ৬২.৬ শতাংশ পুরুষ ও ৩৭.৪ শতাংশ নারী। তবে মৃত্যুর ক্ষেত্রে পুরুষদের হার অনেক বেশি, যা প্রায় ৮৩ শতাংশ। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের ৬০ শতাংশেরই বয়স ৩০ বছরের নিচে।
বর্তমানে দেশের ৫৫টি জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭৬ শতাংশই ঢাকার বাইরের বাসিন্দা। বিভাগীয় পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা ৭৭৯ জন, বরিশাল বিভাগে ৭৭০ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৭৬০ জন। এর বাইরে ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৪৭৫ জন, খুলনায় ২২১, রাজশাহীতে ১৩৩, ময়মনসিংহে ১০৪, সিলেটে ৩৪ এবং রংপুর বিভাগে ২৯ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঢাকার বাইরের মোট রোগীর প্রায় ৪১ শতাংশই মাত্র পাঁচটি জেলার বাসিন্দা। জেলাগুলো হলো—চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও পিরোজপুর। বিপরীতে শরীয়তপুর, চুয়াডাঙ্গা, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে এখন পর্যন্ত কোনো ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায়নি।
পূর্বাভাস ছাড়াই চলছে মশা নিয়ন্ত্রণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর আগাম পূর্বাভাস পাওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রতিবছর বর্ষার আগে, বর্ষাকালে ও বর্ষার পরে—এই তিন দফায় নিয়মিত এডিস মশার ঘনত্ব ও বিস্তার নিয়ে জরিপ করা। কিন্তু গত দেড় বছর ধরে কোনো জাতীয় জরিপই হয়নি। ফলে মশার প্রকৃত ঝুঁকি ও বিস্তার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য ছাড়াই বর্তমানে সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমেদ বলেন, সঠিক ধারণা ছাড়া কার্যক্রম চালালে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে ডেঙ্গুর মৌসুমি ধারা বদলে গেছে বলে উল্লেখ করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন।
তীব্র কীটতত্ত্ববিদ সংকট
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো যোগ্য জনবলের অভাব। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে কেবল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে একজন কীটতত্ত্ববিদ রয়েছেন; বাকি ১১টি সিটি করপোরেশন সম্পূর্ণ কীটতত্ত্ববিদ শূন্য! এ ছাড়া দেশের মাত্র ২৬টি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে কীটতত্ত্ববিদের অনুমোদিত পদ থাকলেও তার সিংহভাগই খালি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদিত ৩৩টি পদের মধ্যে অন্তত ১৮টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক জি এম সাইফুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পরিস্থিতি গুরুতর হলে মশা নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই বিষয়টি গুরুত্ব হারায়। প্রাণহানি কমাতে হলে সারা বছর নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালাতে হবে।
আগস্ট-সেপ্টেম্বরে চূড়ান্ত ঝুঁকির আশঙ্কা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ও মশাবাহিত রোগবিষয়ক গবেষক ড. কবিরুল বাশার সতর্ক করে জানিয়েছেন, এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় আরও খারাপ হতে পারে। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বেশিরভাগ এলাকায় মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের সূচক ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ ২০-এর ওপরে রয়েছে, এমনকি কোনো কোনো এলাকায় তা ৯৩ পর্যন্ত পৌঁছেছে (সাধারণত ২০-এর বেশি হলেই তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ)।
তিনি জানান, ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকার সমস্যা নয়; চট্টগ্রাম, বরিশাল, পিরোজপুর, চাঁদপুর, নরসিংদী, গাজীপুরসহ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে লার্ভার উপস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি চূড়ান্ত পর্যায়ে (পিক টাইম) পৌঁছাতে পারে। তাই এখনই কমিউনিটি পর্যায়ে মানুষকে সম্পৃক্ত করে লার্ভা অনুসন্ধান ও প্রজননস্থল ধ্বংসের ক্রাশ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে।
সরকারের প্রস্তুতি ও জনস্বাস্থ্য ভাবনা
পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, সরকার সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার চালু করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে ফিল্ড হাসপাতালও প্রস্তুত রাখা হবে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত স্যালাইন, টেস্টিং কিট ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুদ রাখা হয়েছে।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল চিকিৎসার প্রস্তুতি বাড়িয়ে ডেঙ্গু ঠেকানো সম্ভব নয়। রোগ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা জরুরি। জরিপ বন্ধ থাকা ও মাঠপর্যায়ের নজরদারির দুর্বলতা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে না পারলে আগামী কয়েক মাসে দেশের স্বাস্থ্য খাত বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।
