সৈয়দা রাজিয়া, মোস্তফা বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের সংগ্রামী সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিশিষ্ট সমাজ সেবিকা
বিশ্বজুড়ে ইরান যুদ্ধের দামামা বাজছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল-গ্যাসের দাম নিম্নমুখী। সৌদি আরামকোর প্রোপেন-বিউটেনের সিপি মে মাসের তুলনায় জুনে কমেছে। এর প্রভাবে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৫৫ টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ১,৮৮৫ টাকা।
কিন্তু বাংলাদেশে চিত্র পুরোপুরি উল্টো। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ৩ মাসেই বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানির দাম লাগামহীনভাবে বেড়েছে। জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে জনগণের পকেট থেকে কৌশলে হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
. ৩ মাসে দফায় দফায় দাম বৃদ্ধি: জনগণের ঘাড়ে বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর এই সরকারের মন্ত্রীরা আবোল তাবোল বলে।
. বিদ্যুৎ: দুর্নীতির পাহাড় চলমান রয়েছে।
১ জুন থেকে খুচরা বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬.৬৮% বাড়িয়েছে বিইআরসি। কোনো কোনো স্ল্যাবে বেড়েছে ১৯.৯৪% পর্যন্ত। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে খুচরা দাম গড়ে ৮.৫% বা ৭০ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। বর্তমানে গড় দাম ইউনিটপ্রতি ৮ টাকা ৯৫ পয়সা, যা আগে ছিল ৮ টাকা ২৫ পয়সা।
সেচে ৪ টাকা ৮২ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫ টাকা ২৫ পয়সা। উচ্চ চাপ শিল্পে ৯ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৭৫ পয়সা।
. জ্বালানি তেল: জ্বালানি খাতে লুটপাট চলছে বর্তমান সময়ে আর জনগণের চোখে দোলা দেওয়া হচ্ছে।
১ জুন দ্বিতীয় দফায় দাম বাড়ানো হয়েছে। কেরোসিন ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা লিটার। ডিজেল অপরিবর্তিত ১১৫ টাকা। এর আগে ১৯ এপ্রিলও ১০-১৫% বাড়ানো হয়েছিল। তখন পেট্রোল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা হয়েছিল।
. গ্যাস:
বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের দাম ইউনিট প্রতি ৭৫ পয়সা বাড়িয়েছে সরকার। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম কমেছে।
. ২৪ ঘণ্টায় ১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই, তবু দাম বাড়তি এবং অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। এই নিয়ে সরকার নিরব মুখে কিছু বলে না আর মনে হয় কানে কিছু শুনি না নিস্তব্ধ। এইভাবে একটি রাষ্ট্র চলতে পারে না। বর্তমান সময়ে জনগণের দাবি বিক্ষোভ মিছিল করছে তেলের দাম বাড়লো কেন জবাব চাই জবাব চাই জ্বালানি খাতে অনিয়ম জবাব চাই জবাব চাই এই নিয়ে ঢাকা রাজপথ শ্লোগানে কম্পিত। এবং মানুষ তাও বলছে শেখ হাসিনার শাসন আমলে জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা ছিল এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ভিতরে ছিল। আর বর্তমান সময়ে সীমার বাহিরে চলে গেছে তার পরেও সরকার পক্ষ থেকে কোন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এবং সরকারের মন্ত্রীরা সকালে বলে এক কথায় আর বিকালে বলে আরেক কথা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, বিদ্যুৎ-গ্যাস অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। দাম বাড়লে সব খাতে খরচ বাড়ে, মূল্যস্ফীতি হয়। গ্রীষ্মে চাহিদা বাড়ায় গ্রামে-মফস্বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না বলে ভোক্তাদের অভিযোগ।
অথচ পাওয়ার ডিভিশন নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫৯,১৪৫ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে।
তিন আমলের দামের তুলনামূলক চিত্র
খাতশেখ হাসিনা সরকার
ডিসেম্বর ২০২৩ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের
অন্তর্বর্তী সরকার
আগস্ট ২০২৪ বর্তমান বিএনপি সরকার
জুন ২০২৬
ডিজেল১০৯ টাকা/লিটার ১০৪ টাকা/লিটার ১১৫ টাকা/লিটার
পেট্রোল১২৫ টাকা/লিটার ১২০ টাকা/লিটার ১৪০ টাকা/লিটার
অকটেন১৩০ টাকা/লিটার ১২৪ টাকা/লিটার ১৪০ টাকা/লিটার
কেরোসিন ১০৯ টাকা/লিটার ১০৪ টাকা/লিটার ১৩৫ টাকা/লিটার
বিদ্যুৎ খুচরা গড় ৮.২৫ টাকা/ইউনিট নির্বাহী আদেশে দাম বাড়ানোর বিধান বাতিল করে গণশুনানি বাধ্যতামূলক করা হয় ৮.৯৫ টাকা/ইউনিট নতুন করে ১৬.৬৮% বৃদ্ধি
১২ কেজি এলপিজি ১,২৮৪ টাকা, ডিসেম্বর ২০২৩ – ১,৮৮৫ টাকা, জুন ২০২৬
শেখ হাসিনা সরকারের শেষ দিকে ২০২৪ সালের মার্চে ডিজেল ১০৯ টাকা, অকটেন ১৩০ টাকা ছিল। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার আগস্ট ২০২৪-এ গণশুনানি ছাড়া দাম বাড়ানোর বিধান বাতিল করে। ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের দাম ৭৫ পয়সা বাড়ানো হয়।
. অর্থনৈতিক মন্দা, কাজ নেই, তবু দামের বোঝা
বিটিএমএ সভাপতি বলছেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ ১০% বাড়বে। উচ্চ সুদ, গ্যাস সংকট ও মজুরি বৃদ্ধির মধ্যে এই বোঝা রপ্তানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নষ্ট করবে। বিজিএমইএ বলছে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না দিয়ে দাম বাড়ানো অযৌক্তিক।
কৃষি, শিল্প, পরিবহন—সবখানে খরচ বাড়ায় মূল্যস্ফীতি ৯.০৪%। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখন তলানিতে।
. ভর্তুকির নামে লুটপাটের অভিযোগ
সরকার বলছে, ইরান যুদ্ধের কারণে আমদানি খরচ বেড়েছে। মার্চ-জুনে শুধু জ্বালানি ও এলএনজিতে ৩১,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি লাগবে। দৈনিক ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার।
অথচ ক্যাব বলছে, দুর্নীতি, সিস্টেম লস ও ক্যাপাসিটি চার্জের কোনো সমাধান না করে বোঝা চাপানো হচ্ছে ছোট ভোক্তার ঘাড়ে।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ সরকার বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে নির্বাহী আদেশে দাম বাড়ানোর ক্ষমতা নিয়েছিল। ইউনূস সরকার সেটা বাতিল করে গণশুনানি বাধ্যতামূলক করে। বর্তমান সরকার আবার নির্বাহী আদেশে দফায় দফায় দাম বাড়াচ্ছে।
জনগণের প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে বাংলাদেশে বাড়ে কেন? ৩ মাসে ২ বার জ্বালানি ও ১ বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে কোন জনস্বার্থ রক্ষা হচ্ছে? ১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং দিয়ে বাড়তি বিল কেন?
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনা, কুইক রেন্টালের ক্যাপাসিটি চার্জ আর ডলার সংকটের দায় জনগণের কাঁধে চাপানো হচ্ছে। ইরান যুদ্ধ কেবল অজুহাত মাত্র।
. টেবিলে শেখ হাসিনা সরকারের আমলের দাম ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের সরকারি তথ্য অনুযায়ী সংশোধন করা হয়েছে।
. এলপিজির দাম ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ১,৩৫৬ টাকা ছিল, জুনে কমে ১,৮৮৫ টাকা নয় বরং ১,৯৪০ থেকে কমে ১,৮৮৫ হয়েছে। দেশের মানুষের প্রত্যাশা জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা যদি ফিরিয়ে আনতে সরকার ব্যর্থ হয় তাহলে মানুষের ভিতরে বেকারত্ব বেড়ে যাবে অর্থনৈতিক অভাব দরজায় এসে নাড়া দিবে। এবং এই সরকার অচিরেই সর্বস্তরের জনগণের সমর্থন হারাবে রাজপথে আন্দোলন বেগবান হবে। বর্তমান পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করলে তাই প্রমাণ করে সরকারের ব্যর্থতা অব্যবস্থাপনা দেশের মানুষকে দিশেহারা করে তুলেছে। দেশের মানুষ এই জায়গা থেকে মুক্তি চায় এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা স্বস্তি জীবন যাপন করার লক্ষ্যে যা করনীয় তাই করবে। জ্বালানি খাতের কঠিন সমস্যা থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার চারিদিকে আওয়াজ উঠেছে এবং ভিন্ন ধরনের স্লোগান শোনা যাচ্ছে। এই শব্দ যদি সরকারের কর্ণপাত না হয় তাহলে সামনের সময় আর ভবিষ্যতেই বলে দিবে জনগণ কি সিদ্ধান্ত নিবে।