বাংলাদেশের রাজনীতিতে বঙ্গভবন থেকে রাষ্ট্রপতির বিদায় ও ক্ষমতার রদবদলের নেপথ্যে ‘অসুস্থতা’ এবং দলীয় রাজনৈতিক চাপ এক পরিচিত অধ্যায়। সম্প্রতি ২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দেশের রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর, রাজনৈতিক মহলে আবারও সরব আলোচনা শুরু হয়েছে বিএনপির শাসনামলে রাষ্ট্রপতি সরানোর নানা ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে।
বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে প্রথম রাষ্ট্রপতি পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন দেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি ও ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল সামরিক শাসনকর্তা হিসেবে জিয়াউর রহমান তাঁর কাছ থেকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেন। বিচারপতি সায়েম তাঁর বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত গ্রন্থ ‘অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেইজ’ (At Bangabhaban: Last Phase)-এ সেই দিনের পরিস্থিতি তুলে ধরে বর্ণনা করেছিলেন—কীভাবে অস্ত্রধারী সৈনিকদের উপস্থিতিতে তাঁকে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্রে সই করতে হয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকেও রাজনৈতিক অমতের কারণে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। বিশেষ করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর কবর জিয়ারত না করার ইস্যুতে দলের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হলে তিনি বিদায় নিতে বাধ্য হন। এমনকি পরবর্তীতে ২০০৪ সালে তাঁর ওপর রাজনৈতিক অনুসারীদের ক্ষোভ প্রকাশের ঘটনাও তৎকালীন রাজনীতিতে বেশ শোরগোল ফেলেছিল।
সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের খবরটি সামনে আসার পর বিরোধী দলসমূহ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ দাবি করছেন, ক্ষমতার রাজনৈতিক সমীকরণে অতীতের মতো এবারও অনুরূপ ধারার প্রতিফলন ঘটেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির কৌশলগত অবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের ধারাবাহিকতাকে অতীত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সাথে তুলনা করছেন অনেকেই।
যদিও বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের মতে, রাজনৈতিক সংস্কার, সংবিধানের মর্যাদা ও প্রশাসনিক গতিশীলতা নিশ্চিত করতেই রাষ্ট্রীয় পদে পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছিল। তবে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপ্রধানদের বিদায় ও পদত্যাগের নেপথ্য ঘটনাগুলো বারবার প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি পদের পরিবর্তন কেবল শারীরিক স্বাস্থ্যের বিষয় নয়, বরং তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গতিপথ ও দলীয় মনস্তত্ত্বের গভীর সমীকরণের সাথে যুক্ত।
