হুমায়ূন কবীর ঢালী
২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, কারণ এদিন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের রিয়্যাক্টর কোরে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার আমলে রাশিয়ার কারিগরি সহযোগিতায় শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ও বাস্তব পর্যায়ে প্রবেশ করল। ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর জ্বালানি গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’-এর সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল।
আজকের এই জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই কেন্দ্রটি থেকে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে, যা দেশের জাতীয় গ্রিডে ১২০০ মেগাওয়াট কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ যুক্ত করার পথে এক অভাবনীয় অগ্রগতি। তবে আপাতত জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।
এটি দীর্ঘ ছয় দশকের বঞ্চনা শেষে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জনের এক অনন্য বাস্তবায়ন। বর্তমান সরকার স্বীকার করুক বা না করুক, এই প্রকল্পের জন্য রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা অবশ্যই কৃতিত্বের দাবিদার।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে এই সত্য প্রতীয়মান হয় যে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের এক অনন্য দলিল। ইতিহাস বলে, ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৬ সালের মধ্যে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণ এবং প্রাথমিক কিছু অবকাঠামো নির্মিত হয়। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণের কারণে প্রকল্পটি বারবার থমকে যায়।
ঠিক একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে Karachi Nuclear Power Plant (KANUPP)-এর কাজ শুরু হয় ১৯৬৬ সালে এবং ১৯৭১ সালের অক্টোবরে সেটি চালু হয়ে যায়। রূপপুরের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ও মনোযোগ বারবার পশ্চিম পাকিস্তানে সরিয়ে নেওয়া ছিল তৎকালীন বৈষম্যের বড় উদাহরণ। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সরকার প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে দেয়, এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি চরম বৈষম্যের প্রতিফলন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই অবিচারের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সোচ্চার ছিলেন। ১৯৬৯ সালের অক্টোবর মাসে লালমনিরহাটের এক বিশাল জনসভায় তিনি রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার নির্দেশ দেন এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (BAEC) গঠন করেন। প্রকল্পটি নতুন প্রাণ পায়। ১৯৭২ সালের মে মাসে তিনি ঘোষণা করেন যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ দ্রুত শুরু করা হবে। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনাও শুরু করেছিলেন।
কিন্তু ১৯৭৫ সালে তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর প্রকল্পটি কয়েক দশকের জন্য হিমঘরে চলে যায়। এই নিয়ে পরবর্তী সরকারের আমলে কোনো প্রকার পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সদিচ্ছার অভাবে প্রকল্পটি দীর্ঘকাল স্থবির থাকে।
দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার চূড়ান্ত উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ করা হয়। মূল বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং এর চারপাশের আবাসিক এলাকা (গ্রিন সিটি) মিলিয়ে মোট জমির পরিমাণ প্রায় ১,০৬২ একর।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাস্তবায়নে রাশিয়া কারিগরি ও আর্থিক—উভয় দিক থেকেই বাংলাদেশের প্রধান অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। এই সহযোগিতার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সালের ২১ মে, যখন পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে একটি ‘ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য ২০১৩ সালে রাশিয়ার সহায়তায় ৫০০ কোটি ডলারের (৫ বিলিয়ন) একটি প্রাথমিক ঋণ চুক্তি সই করা হয়।
এরপর ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল অবকাঠামো নির্মাণের লক্ষ্যে ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ১,১৩,০০০ কোটি টাকা) একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই বিশাল ব্যয়ের ৯০ শতাংশ রাশিয়ান সরকার ঋণ হিসেবে প্রদান করছে, যা বাংলাদেশ পরবর্তী ২৮ বছরে পরিশোধ করবে।
প্রকল্পটির আধুনিক বাস্তবায়নের পথে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের মূল রিয়্যাক্টর ভবনের কংক্রিট ঢালাই উদ্বোধন করেন, যা নির্মাণের মূল পর্যায়ের সূচনা করে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর রাশিয়ার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করা হয়। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের মাধ্যমেই বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’-এর সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
এটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
তবে এই প্রকল্পের উপযোগিতা ও বিশাল ব্যয় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও কম নয়। ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিনে পরিণত হয় যখন রাশিয়ার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করা হয়। জ্বালানি হস্তান্তরের দিন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি রাজনৈতিক সভায় বলেছিলেন এই কেন্দ্রটি শেষ পর্যন্ত ‘জনগণের কাজে আসবে না’।
তিনি মূলত এর উচ্চ নির্মাণ ব্যয় এবং বিশাল বৈদেশিক ঋণের বোঝার দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন। তা সত্ত্বেও, জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই উন্নয়ন ও জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে রূপপুর প্রকল্পটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (BAEC): রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঐতিহাসিক সময়রেখা, ভূমি অধিগ্রহণ এবং রাশিয়ার সাথে স্বাক্ষরিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তির তথ্যাবলি।
২. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ: প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন এবং ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর ইউরেনিয়াম হস্তান্তর অনুষ্ঠানের অফিশিয়াল বিজ্ঞপ্তি।
৩. ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (IAEA): করাচি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (KANUPP) নির্মাণের ইতিহাস এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা মানদণ্ড বিষয়ক প্রতিবেদন। [উল্লেখ্য, ১৯৫৭ সালের ২৯ জুলাই জাতিসংঘের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সদর দপ্তর অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অবস্থিত। সংস্থাটির মূল লক্ষ্য হলো “Atoms for Peace and Development”। অর্থাৎ, পারমাণবিক শক্তিকে যুদ্ধের কাজে ব্যবহার না করে চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো মানবিক ও শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার নিশ্চিত করা।]
৪. জাতীয় আর্কাইভ ও সংবাদপত্র (১৯৬৯-১৯৭০): ১৯৬৯ সালের অক্টোবরে লালমনিরহাটে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সংবাদ এবং ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক প্রকল্প বাতিলের প্রতিবেদন (দৈনিক ইত্তেফাক ও তৎকালীন আজাদ আর্কাইভ)।
৫. সংবাদ মাধ্যম (২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর): বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য এবং জ্বালানি হস্তান্তর বিষয়ক প্রতিবেদন (তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা, প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার)।
৬. বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন: ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের গেজেটসমূহ যেখানে পারমাণবিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁর চিন্তাধারার উল্লেখ রয়েছে।
