কলাম লেখক: সৈয়দা রাজিয়া মোস্তফা বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের সংগ্রামী সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিশিষ্ট সমাজ সেবিকা
মহাকালের নির্মম অবসানে এশিয়া উপমহাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বারবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, মাননীয় সাবেক মন্ত্রী জনাব তোফায়েল আহমেদ নশ্বর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে অনন্তলোকের পথে যাত্রা করেছেন।
তিনি দীর্ঘদিন মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। সেই মুমূর্ষু অবস্থাতেও তথাকথিত বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার খড়গ তাঁর ওপর নেমে এসেছিল। মিথ্যা মামলা, বানোয়াট অভিযোগ আর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে এক অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকারে পরিণত করা হয়েছিল। হাসপাতালের বেডে যখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখনও তাঁর নামে ওয়ারেন্ট ঝুলছিল। এই হলো বিএনপির তথাকথিত আইনের শাসন— যেখানে মৃত্যুপথযাত্রীকেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভেবে দমন করা হয়।
মৃত্যুর পরও নিস্তার মেলেনি। তাঁর জানাজা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বাধার সম্মুখীন হয়েছে। লাঠিয়াল পুলিশ বাহিনী দিয়ে জানাজার মাঠ ঘিরে ফেলা হয়েছিল। সেখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ৬০ জন নেতাকর্মীকে বিনা অভিযোগে, অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আজ জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন— এই কি সেই বাংলাদেশ? এই কি আইনের শাসন? এই পুলিশ বাহিনী কি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণের, নাকি জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির দলীয় ক্যাডার বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে?
শত বাধা, শত প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল জানাজায়। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়েছে ঢাকার রাজপথ। শোকাহত মানুষের অশ্রুসিক্ত চোখ আর বজ্রকণ্ঠের স্লোগান প্রমাণ করেছে— তোফায়েল আহমেদ শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি ইতিহাস, একটি অনুভূতির নাম। বাংলার অলিগলি, পথে-প্রান্তরে তাঁর স্মৃতি, তাঁর সংগ্রাম মিশে আছে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন তিনি। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রতিটি জাতীয় আন্দোলনে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ বাঙালি জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়ে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছিলেন। অথচ আজ রাষ্ট্র তাঁকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণের দাবি ছিল— মহান জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হোক। এই ন্যূনতম সম্মানটুকুও এই সরকার দেয়নি, বরং নির্লজ্জভাবে বাধা সৃষ্টি করেছে। পরিবারের অভিযোগ— বিনা চিকিৎসায় বন্দি রেখে, সুচিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
আজ দেশবাসীর মনে প্রশ্ন জাগে— আইনের শাসন কি বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত? নাকি তা দলীয় লেজুড়বৃত্তির কাছে জিম্মি? মানবাধিকার কি তবে কবরে? বাকস্বাধীনতাকে শৃঙ্খলিত করে কালো আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মতো প্রাচীনতম রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রমকে অবৈধভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
যে আওয়ামী লীগের কোটি কোটি কর্মী-সমর্থক আছে, যে দলকে দেশের ৬০% মানুষ সমর্থন করে, যে দল বারবার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, উন্নয়নের রোল মডেল সৃষ্টি করেছে— সেই দলকে নিষিদ্ধ করার দুঃসাহস দেখানো হয়েছে।
প্রিয় দেশবাসী, আপনারা দেখেছেন রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে নির্বিকার। সরকারি দলকে তুষ্ট করতে কীভাবে তারা জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে— এই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বেতন হয় সর্বস্তরের মানুষের রক্ত-ঘামের করের টাকায়। তাদের পরিবার চলে জনগণের অর্থে। ইতিহাস সাক্ষী— যারা জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, ইতিহাস তাদের ক্ষমা করে না। তাদের পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা ভবিষ্যতই বলে দেবে।
সময় চিরস্থায়ী নয়। আজ যারা ক্ষমতার মসনদে বসে দম্ভ আর অপব্যবহারের মহোৎসব করছে, তারা অতীত ও বর্তমানের ইতিহাস বিস্মৃত হয়েছে। কিন্তু তাদের কলঙ্কিত অধ্যায় ইতিহাসের পাতায় কালো কালিতে লিপিবদ্ধ থাকবে। জনগণ, দেশবাসী তাদের ক্ষমা করবে না।
এই দেশে আবারও গণবিপ্লব হবে, গণআন্দোলন হবে। দেশ রক্ষার সংগ্রাম হবেই। তোফায়েল আহমেদের জানাজায় জনতার যে বাঁধভাঙা জোয়ার, যে বজ্রনির্ঘোষ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান— তাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
এই কিংবদন্তি রাজনীতিবিদের চিরবিদায়ে তাঁর আত্মার মাগফেরাত ও চিরশান্তি কামনা করি। তিনি ছিলেন, তিনি আছেন, তিনি থাকবেন— বাংলাদেশের ইতিহাসে, কোটি মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়।
