রাজধানীর মিরপুরে সাত বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশু রামিশাকে ধর্ষণ ও হত্যার পর পুলিশি তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ঈদের ছুটির মধ্যেও বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যাকাণ্ডের পর দ্রুততম সময়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। আবার গণমাধ্যমের পাতায় সংবাদ প্রকাশের পর নেত্রকোনার আব্দুল মজিদ সরকারি ভাতার নথিতে ‘মৃত’ তালিকা থেকে জীবিত হয়ে নিজের নাগরিক অধিকার ফিরে পেয়েছেন।
এই খবরগুলো যখন গণমাধ্যমে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পায়, তখন আপাতদৃষ্টে মনে হয় দেশে আইন আছে, প্রশাসন সক্রিয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র তৎপর। মনে হয়, অপরাধ যত বড়ই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলছে।
কিন্তু এই দৃশ্যমান স্বস্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল বাস্তবতা অত্যন্ত নির্মম, অস্বস্তিকর ও আশঙ্কাজনক। কারণ সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহ দেশের সাধারণ নাগরিকদের মনে এমন একটি গভীর ধারণার জন্ম দিচ্ছে যে—এ দেশে বিচার পাওয়া, প্রশাসনিক প্রতিকার বা নাগরিক সেবা পাওয়া অনেকাংশে নির্ভর করছে কোনো ঘটনা কতটা আলোচনায় এসেছে, গণমাধ্যমে কতটা জায়গা পেয়েছে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতটা ‘ভাইরাল’ হয়েছে তার ওপর।
দৃশ্যমানতার রাজনীতি ও বিচারের বৈষম্য
সামগ্রিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, রামিশার প্রতি সংঘটিত নির্মমতার বিচার চেয়ে দেশজুড়ে মানুষ সোচ্চার হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের ঝড় উঠেছিল, গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফলে রাষ্ট্র ও প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে এবং ঈদের ছুটির মধ্যেও বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ দেখা গেছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু একই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আরও অনেক শিশু ও নারী ধর্ষণ এবং যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তাদের কান্না জাতীয় আলোচনায় জায়গা পায়নি, তাদের ছবি মানুষের ফেসবুক টাইমলাইনে ঘোরেনি, তাদের নামও অধিকাংশ মানুষ জানে না। ফলে তাদের মামলার অগ্রগতি কী, তারা আদৌ কখনো ন্যায়বিচার পাবেন কি না—সেসব প্রশ্ন চিরকালই জনআলোচনার বাইরে থেকে যায়।
বুলেট বৈরাগীর হত্যাকাণ্ডও একই বাস্তবতার আরেকটি প্রতিচ্ছবি। একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হওয়ায় গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার হলো, দ্রুত অভিযান চালিয়ে আসামিদের ধরাও হলো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিদিন যেসব সাধারণ মানুষ ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন বা সড়কে প্রাণ হারাচ্ছেন, তাদের সবার ক্ষেত্রে কি রাষ্ট্র এমন ক্ষিপ্রতা দেখায়? প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ছিনতাই, সন্ত্রাসী হামলা কিংবা সহিংসতার শিকার হয়ে নীরবে চোখের জল ফেলছেন। কেউ কেউ প্রশাসনিক গাফিলতি ও ভুল সিদ্ধান্তের কারণে জীবদ্দশাতেই ‘মৃত’ তালিকায় স্থান পেয়ে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নেত্রকোনার আব্দুল মজিদ ভাগ্যবান ছিলেন, কারণ তাঁর কষ্টের গল্পটি সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছিল। রাষ্ট্র তাঁকে দেখেছিল, প্রশাসন বাধ্য হয়েছিল কাজ করতে।
এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার কিংবা নাগরিক সেবা কখনো ‘দৃশ্যমানতা’ বা ‘ভাইরাল’ হওয়ার ওপর নির্ভর করতে পারে না। বিচার কোনো সৌভাগ্যের বিষয় হতে পারে না; এটি নাগরিকের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার।
পরিসংখ্যানের আড়ালে আস্থাহীনতার চিত্র
এই পরিস্থিতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; দেশের সামগ্রিক অপরাধচিত্রেও এর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে অপরাধের গ্রাফ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। কেবল ২০২৫ সালেই দেশে প্রায় ১ হাজার ৯৩০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১১ জন মানুষ খুন হয়েছেন। ছিনতাই ও দস্যুতার মামলার সংখ্যাও দুই হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কেবল ছিনতাইকারীদের হামলায়ই কয়েক মাসে অন্তত ১৬ জন নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এর বাইরেও রয়েছে সন্ত্রাসী হামলা, রাজনৈতিক সহিংসতা, দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, মাদক-সংক্রান্ত হত্যাকাণ্ড এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের নামে অসংখ্য রক্তপাত। কিন্তু এসব ঘটনার খুব অল্প অংশই জাতীয় আলোচনায় আসে। অধিকাংশ ভুক্তভোগী মানুষ নীরবে হারিয়ে যায় পরিসংখ্যানের ভিড়ে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, দেশের মানুষ ধীরে ধীরে প্রচলিত আইনের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে—বিচার পেতে হলে আগে আলোচনায় আসতে হবে, সংবাদ হতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রেন্ডিং হতে হবে। এই মানসিকতা একটি রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও সুশাসনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ যখন মানুষ বিশ্বাস হারায় যে রাষ্ট্র তাকে রক্ষা করবে, তখন কেউ নীরবে অন্যায় মেনে নেয়, আবার কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উদ্ধত হয়।
‘মব জাস্টিস’ ও আইনের শাসন বিপন্ন
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির ভয়াবহ বৃদ্ধি সেই আস্থাহীনতারই এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিল ৫১ জন। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা আড়াই গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১২৮ জনে। আর ২০২৫ সালে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২০০-এর কাছাকাছি পৌঁছায়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, শুধু ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসেই ২৭৬টি মব সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ১৫৬ জন নিহত এবং ২৪২ জন আহত হয়েছেন। এই সংখ্যাগুলো কেবল কোনো শুষ্ক পরিসংখ্যান নয়; এগুলো রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের কমে যাওয়া বিশ্বাসের জীবন্ত দলিল।
মানুষ যখন মনে করে আইনের মাধ্যমে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার পাওয়া সম্ভব নয়, তখন তারা নিজেরাই বিচারক হয়ে উঠতে চায়। কেউ চোর সন্দেহে ধরা পড়লেই তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার বদলে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। গুজব ছড়ালেই জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে সহিংস করে তুলছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উপস্থিত থেকেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার চার বছরের শিশু ধর্ষণকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ নাগরিকের বিচারের প্রতি চরম আস্থাহীনতারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
কাঠামোগত দুর্বলতা ও বৈশ্বিক শিক্ষা
এই বাস্তবতার পেছনে আমাদের বিচার ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কিছু মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে:
- প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা: আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এখনো অনেকাংশে ‘রিঅ্যাক্টিভ’ বা প্রতিক্রিয়াশীল। অর্থাৎ অপরাধ ঘটার আগে তা প্রতিরোধ করার চেয়ে, ঘটনা ঘটার পর জনমত বা আলোচনার চাপ তৈরি হলে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
- জবাবদিহিতার ঘাটতি: প্রশাসনিক ভুল সিদ্ধান্ত, গাফিলতি কিংবা দায়িত্বে অবহেলার জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা খুব কমই নেওয়া হয়।
- বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা: বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকা সাধারণ মানুষকে আশাহত ও ক্ষুব্ধ করে তোলে।
- সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব: আমাদের বিচার ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি প্রভাবমুক্ত নয়। প্রভাবশালীরা তুলনামূলক দ্রুত আইনি সুরক্ষা পান, অথচ সাধারণ মানুষকে আদালতের বারান্দায় দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, যা আইনের সমতার নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই ধরনের সংকট কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে কাটিয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্যে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি সংস্থা কাজ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে বডি ক্যামেরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আবার এস্তোনিয়ার মতো দেশ ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে প্রশাসনিক সেবাগুলোকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যেখানে আমলাতান্ত্রিক ভুলের কারণে একজন জীবিত মানুষকে নথিতে ‘মৃত’ বানিয়ে ফেলার সুযোগ প্রায় শূন্য।
শেষ কথা: ভাইরাল কনটেন্ট বনাম মানুষের জীবন
বাংলাদেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থায় এখন আমূল পরিবর্তন জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ বা পূর্ব-সক্রিয় হতে হবে। কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে প্রতিটি অপরাধের সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে, যাতে মানুষকে বছরের পর বছর আদালতের পেছনে ঘুরে সর্বস্বান্ত হতে না হয়। একই সঙ্গে গুজব ও উসকানি প্রতিরোধে জনসচেতনতা এবং কার্যকর ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রকে তার নাগরিককে ‘ভাইরাল কনটেন্ট’ হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। একজন সাধারণ মানুষের জীবন বা মর্যাদা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো ট্রেন্ডিং পোস্টের সঙ্গে তুলনাযোগ্য হতে পারে না।
আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট কেবল অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়; বরং মানুষের মনে জন্ম নেওয়া সেই ভয়ংকর বিশ্বাস—‘ভাইরাল না হলে বিচার নেই।’ এই অবিশ্বাস যদি সমাজে আরও গভীরে শিকড় ছড়ায়, তবে সামনে আরও কঠিন ও অন্ধকার সময় অপেক্ষা করছে। তখন দেশে আইন থাকবে, আদালত থাকবে, বড় বড় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকবে; কিন্তু কেবল থাকবে না মানুষের আস্থা। আর যে রাষ্ট্রে মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে, সেখানে শেষ পর্যন্ত আইনের শাসন নয়—অরাজকতা ও জনতার ক্ষুব্ধ রায়ই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
