মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে গড়া দেশের অন্যতম প্রধান অলাভজনক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ এখন গভীর সংকটে। অভিযোগ উঠেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের প্রভাব খাটিয়ে এবং এক পরিকল্পিত ‘মব’ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির একমাত্র জীবিত প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদকে অপমানজনকভাবে বের করে দেওয়া হয়েছে। সাভারের মির্জানগরে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সদর দপ্তরে গত ২৪ আগস্ট ঘটা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে।
অনুসন্ধানী তথ্যে যা উঠে এসেছে:
১. মব সৃষ্টি ও পদত্যাগে বাধ্য করা: অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ২৪ আগস্ট দুপুরে প্রায় ৫০-৬০ জনের একটি দল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সদর দপ্তরে প্রবেশ করে। তারা তৎকালীন পরিচালক ডা. মাহবুব জুবায়ের এবং প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদকে ঘিরে ধরে চার ঘণ্টা ধরে মানসিক ও শারীরিক হেনস্তা করে। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতেই তাদের জোরপূর্বক পদত্যাগে সই করতে বাধ্য করা হয়।
২. সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সম্পৃক্ততা: ভুক্তভোগী ডা. নাজিমউদ্দিন অভিযোগ করেছেন, মবকারীদের ফোনে সরাসরি নির্দেশনা দিচ্ছিলেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, “প্রশাসনের কর্মকর্তারা আমাকে পদত্যাগের অনুরোধ জানাচ্ছিলেন কারণ ওপর মহলের চাপ ছিল। ফোন লাউড স্পিকারে দিয়ে শোনানো হয় যে রিজওয়ানা হাসান বলছেন— ‘ডাক্তার নাজিমকে বের করেন, যেকোনো মূল্যে বের করেন, নইলে অ্যারেস্ট করেন।’”
৩. অবৈধ ট্রাস্টি বোর্ড গঠন: ট্রাস্ট আইন-১৮৮২ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠাতা ছাড়া বোর্ড গঠনের এখতিয়ার নেই। অথচ অভিযোগ উঠেছে, গত বছর একটি ভুয়া দলিল তৈরি করে নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়, যেখানে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও শিরীন হকসহ সাতজন নিজেদের মনোনীত সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। এই বোর্ডে এমন ব্যক্তিদেরও স্থান দেওয়া হয়েছে যারা একসময় দুর্নীতির দায়ে প্রতিষ্ঠান থেকে বরখাস্ত হয়েছিলেন।
৪. মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা: ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ ছিলেন একাত্তরের বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালের অন্যতম প্রধান কারিগর। প্রচারবিমুখ এই নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসককে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মূল আদর্শ বিচ্যুত করা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে এক বছর আগে একইভাবে বের করে দেওয়া হয়েছিল সিডনি ফেরত বিখ্যাত ইউরোলজিস্ট ডা. গিয়াস উদ্দিন আহমেদকেও।
অভিযুক্তদের প্রতিক্রিয়া:
অভিযোগের বিষয়ে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মনজুর কাদির আহমেদ জানিয়েছেন, আইনি বিষয়গুলো তাদের ল’ অ্যাডভাইজার দেখেন। অন্যদিকে, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি এবং মেসেজের কোনো উত্তর দেননি।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মতো একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি স্বার্থে বা রাজনৈতিক শক্তিতে কুক্ষিগত করার এই প্রচেষ্টা এখন সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ভুক্তভোগী ডা. নাজিমউদ্দিন এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও পুনরায় স্বচ্ছ ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সূত্র : কালের কণ্ঠ
