রাজধানীর পল্লবীতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রতিবেশী কর্তৃক ৮ বছরের শিশু রামিসার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে সারা দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ, শোকাহত এবং বিচলিত। এই ক্ষোভ স্বাভাবিক। একটি শিশুর ওপর এমন নৃশংসতা কোনও সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারে না। কেবল রামিসা একা এ ধরনের নৃশংসতার শিকার নয়— এই নৃশংসতার শিকার হয়েছে রামিসার বয়সী আরও অনেক কন্যাশিশু, ছাড় পায়নি ছেলে শিশুরাও। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে অন্তত ১৮৯০ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১৪০৭ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, ৫৮০ জন ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। একই সময়ে ৪৮৩ জন শিশুর মৃত্যু ঘটে। সংস্থাটির আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২০ মাসে ৬৪৩ শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনে নিহত হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতি মাসে ৩২ জনের বেশি শিশু নিহত হয়।”
সুতরাং, ধর্ষণ এবং ধর্ষণ পরবর্তী খুন যেন এক মহামারি আকার ধারণ করেছে। স্বাভাবিকভাবেই জনমনে বিরাজ করছে উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠা। অপরাধীদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তির দাবিও তাই স্বাভাবিক। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিচার বিভাগের কার্যকারিতা, বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ এবং বিচার ব্যবস্থাকে এমনভাবে ঢেলে সাজানো—যাতে বিচারের পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় একটি শ্রেণি দেশে শরিয়া আইন কায়েমের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। বিষয়টি এমন যেন অপরাধের মূল কারণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নয় বরং বিদ্যমান আইন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে প্রস্তাব করেছেন—“শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকারীদের শাস্তি হওয়া উচিত প্রকাশ্যে একশত দোররা (বেত্রাঘাত), এরপর অপরাধী বেঁচে থাকলে ফাঁসি।” তাঁর এই প্রস্তাব বিচারতত্ত্ব, আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং আধুনিক সভ্যতার মৌলিক নীতির সঙ্গে গভীরভাবে সাংঘর্ষিক এবং একটি ন্যায় ও কল্যাণরাষ্ট্র বিনির্মাণের জন্য বড় প্রতিবন্ধক। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই বক্তব্য এসেছে এমন একজনের কাছ থেকে, যাঁর কাছ থেকে নাগরিক সমাজ আবেগ নয়, বরং আইনের ভাষায় বিশ্লেষণ প্রত্যাশা করে। বস্তুত, একজন আইনের অধ্যাপকের দায়িত্ব জনতার ক্ষোভকে উসকে দেওয়া নয়, বরং সেই ক্ষোভকে আইনের শাসনের কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত করতে উৎসাহিত করা। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি বিচারতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের বদলে একটি জনপ্রিয় কিন্তু বিপজ্জনক অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
আমার আশঙ্কা, এই ধরনের বক্তব্য এবং প্রস্তাবের উদ্দেশ্য প্রকৃত সমস্যার সমাধান নয়, বরং জনরোষকে সাময়িকভাবে প্রশমিত করা। এটি এমন এক প্রস্তাব, যা জনতাকে খুশি করতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক দুর্বলতা হলো— তিনি শাস্তির দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দর্শনকে একটি কন্ডিশনালের অনুগ হিসেবে একসঙ্গে ব্যবহার করেছেন, যা কার্যত শূন্য ফলাফল সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রস্তাবে একদিকে বলা হচ্ছে— শাস্তি এমন হওয়া উচিত যাতে “মানুষের মনে শান্তি আসে।” অপরদিকে বলা হচ্ছে— শাস্তি এমন হওয়া উচিত যাতে “অপরাধীরা ভয় পায়”। অথচ, তাঁর প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় এই দুটি উদ্দেশ্যের কোনোটি সফল হবে না। বরং চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, মানসিক ট্রমা এবং সহিংসতা বৃদ্ধি পাবে।
শাস্তি ও বিচার নিয়ে দর্শনে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মতবাদ রয়েছে। প্রতিফলবাদ মনে করে অপরাধী শাস্তি পাবে কারণ সে শাস্তির যোগ্য। এখানে ন্যায়বিচার ও প্রাপ্যতার সমানুপাতিক ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে উপযোগবাদী মতবাদ শাস্তিকে দেখে ভবিষ্যৎ অপরাধ কমানোর উপায় হিসেবে—যাতে ভয় সৃষ্টি হয়, সমাজ নিরাপদ থাকে এবং অপরাধী সংশোধিত হয়। অর্থাৎ, রিট্রিবিউটিভিজম যেখানে সমানুপাতিকতাকে মূল ভিত্তি মনে করে, ডিটারেন্স থিওরি সেখানে উপযোগিতাকে শাস্তির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আবার সংশোধনমূলক মতবাদ অপরাধীর মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ওপর জোর দেয়।
প্রতিফলবাদ ধারার প্রভাবশালী সমর্থক ইমানুয়েল কান্টের মতে, হত্যাকারী মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য, কারণ ন্যায়বিচার দাবি করে—অপরাধী তার প্রাপ্য শাস্তি লাভ করবে। লক্ষণীয় যে কান্ট মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন করেছিলেন অপরাধ প্রতিরোধের উপায় হিসেবে নয়, বরং অপরাধীর প্রাপ্য শাস্তি হিসেবে। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের যৌক্তিকতা এখানে ভবিষ্যৎ অপরাধ কমানো নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। ফলে ‘অপরাধী তার প্রাপ্য শাস্তি পাক’ এবং ‘অপরাধীরা ভয় পাবে’—এই দুটি যুক্তি একই নয়, এগুলো শাস্তিতত্ত্বের দুটি ভিন্ন ধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
কান্ট তাঁর ‘গ্রাউন্ডওয়ার্ক অব দ্য মেটাফিজিক্স অব মোরালস (১৭৮৫)’ গ্রন্থে দাবি করেছেন যে মানুষ কখনোই শুধুমাত্র অন্যের উদ্দেশ্য পূরণের মাধ্যম হতে পারে না। সুতরাং, অপরাধীকে কখনোই ‘প্রদর্শনীর বস্তু’ বা জনতার আবেগ এবং ক্রোধ প্রশমনের উপকরণে পরিণত করা যাবে না। শাস্তির উদ্দেশ্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, জনতার বিনোদন বা প্রতিশোধস্পৃহা পূরণ করা নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকাশ্য বেত্রাঘাত বা মৃত্যুদণ্ডের প্রস্তাব কান্টের মানব মর্যাদার ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, এই ধারণা মূলত অপরাধীকে জনতার ক্রোধ প্রশমনের একটি উপকরণে পরিণত করে। আর অপরাধীকে নৈতিক বিচারের বিষয় থেকে সরিয়ে জনতার সামনে প্রদর্শনের বস্তুতে পরিণত করে হিংস্রতা এবং নৃশংসতাকে উসকে দেওয়া ন্যায়বিচারের অংশ হতে পারে না।
ব্রিটিশ দার্শনিক ডব্লিউ ডি রস তাঁর দ্য রাইট অ্যান্ড দ্য গুড গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে ন্যায়বিচারের ধারণা আপাত দৃষ্টিতে যেমন মনে হয়, কার্যত তার চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম এবং জটিল। রসের মতে, ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ডিজার্ট—অর্থাৎ প্রাপ্যতা। প্রতিটি মানুষ তার প্রাপ্য জিনিসটি পাবে। অর্থাৎ, ভালো কাজ করলে পুরস্কার, অন্যায় করলে শাস্তি ব্যক্তির প্রাপ্য। কিন্তু ডিজার্ট মানে জনতার ক্ষোভ প্রশমিত করা বা প্রতিশোধস্পৃহা মেটানো নয়, বরং ডিজার্ট মানে হলো অপরাধী শাস্তির যোগ্য হলে তা নিশ্চিত করা।
রসের দর্শন প্রাইমা ফেসি ডিউটি নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি জাস্টিসের পাশাপাশি বেনিফিসেন্স, নন-ম্যালিফিসেন্স, ফিডেলিটি, রিপারেশন এবং সেলফের ইমপ্রুভমেন্টের মতো একাধিক প্রাইমা ফেসি ডিউটির কথা বলেছেন (ডব্লিউ. ডি. রস, দ্য রাইট অ্যান্ড দ্য গুড, ১৯৩০)। শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ক্ষেত্রে অবশ্যই রাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী প্রাইমা ফেসি ডিউটি অব জাস্টিস আছে। অপরাধীকে শাস্তি দিতেই হবে। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নন-ম্যালিফিসেন্স-এর ডিউটি আছে—অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি না করা। রাষ্ট্রের বেনিফিসেন্সের ডিউটি আছে—সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের আইনের শাসন বজায় রাখার ডিউটি আছে। প্রশ্ন
, প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত বা মৃত্যু কার্যকর করা কি এসব ডিউটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে? নাকি জাস্টিসের নামে অন্য সব নৈতিক কর্তব্যকে উপেক্ষা করে? মানবাধিকার লঙ্ঘন করে?
প্রকাশ্যে একশত বেত্রাঘাতের প্রস্তাব কার্যকর হবে কিনা, সেই প্রশ্নের আগেও জিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন— একটি আধুনিক রাষ্ট্রের এমন শাস্তি দেওয়ার নৈতিক অধিকার আছে কিনা? কারণ কোনও কোনও শাস্তি অপরাধীর প্রাপ্য হলেও তা ন্যায়সঙ্গত নাও হতে পারে। আধুনিক মানবাধিকার ধারণার অন্যতম ভিত্তি হলো— একজন ব্যক্তি অপরাধী হলেও তার মানবিক মর্যাদা (হিউম্যান ডিগনিটি) রক্ষা করা। শাস্তি তাকে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করতে পারে, এমনকি কোনও কোনও শাস্তি তার জীবন কেড়ে নিতে পারে; কিন্তু তাকে জনসমক্ষে অপমান, প্রদর্শন বা শারীরিক নির্যাতনের বস্তুতে পরিণত করার অধিকার কোনও সভ্য রাষ্ট্রের অধিকার হতে পারে না। এ কারণেই আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে বেত্রাঘাত, অঙ্গচ্ছেদ এবং অন্যান্য শারীরিক শাস্তিকে সাধারণত নৃশংস, অমানবিক এবং অবমাননাকর শাস্তি হিসেবে দেখা হয়। সুতরাং, অপরাধীর শাস্তি এবং অপরাধীর অপমান দুটি আলাদা বিষয়।
অপরদিকে, বেন্থাম এবং মিল সমর্থিত ডিটারেন্স থিওরির দৃষ্টিকোণ থেকেও এই প্রস্তাব প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা, তখন প্রশ্ন থেকে যায়, প্রকাশ্য বেত্রাঘাত কি সত্যিই ধর্ষণ কমাতে সক্ষম? এর সপক্ষে কি তথ্য এবং প্রমাণ আছে? অপরাধবিজ্ঞানের দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে শাস্তির কঠোরতার চেয়ে শাস্তির নিশ্চয়তা অপরাধ দমনে বেশি কার্যকর। আধুনিক অপরাধবিজ্ঞানের জনক চেজারে বেক্কারিয়া অনেক আগেই যুক্তি দিয়েছিলেন যে “অপরাধ কমাতে নিষ্ঠুর শাস্তির চেয়ে দ্রুত ও নিশ্চিত শাস্তি অধিক কার্যকর। ”(চেজারে বেক্কারিয়া, অন ক্রাইমস অ্যান্ড পানিশমেন্টস, ১৭৬৪)।
বেক্কারিয়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তাঁর মতে, যেসব সমাজে রাষ্ট্র সবচেয়ে নিষ্ঠুর শাস্তি প্রয়োগ করেছে, সেসব সমাজই অনেক ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহিংস থেকেছে। কারণ আইনপ্রণেতা এবং অপরাধী উভয়েই তখন একই নৃশংসতার ভাষায় কথা বলতে শুরু করে (চেজারে বেক্কারিয়া, অন ক্রাইমস অ্যান্ড পানিশমেন্টস, ১৭৬৪)। রাষ্ট্র যখন প্রকাশ্যে সহিংসতাকে বৈধতা দেয়, তখন সেটি সমাজকেও আরও সহিংস করে তোলে। এই কারণেই আধুনিক ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা শাস্তির নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে তার বিচার নিশ্চিত করা, ন্যায্যতা এবং প্রক্রিয়াগত বৈধতার ওপর গুরুত্ব দেয়।
সমসাময়িক অপরাধবিজ্ঞানের পরিসংখ্যানও একই দিকে ইঙ্গিত করে। দ্য সেন্টেন্সিং প্রজেক্ট-সহ একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে যে ১৯৭০ থেকে ২০০০-এর দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে কারাবন্দির সংখ্যা কয়েকশ’ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সহিংস ও সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধের হার ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছালেও বহু অঙ্গরাজ্যে কারাবন্দিত্ব আবার বাড়ছে। প্রতিবেদনের উপসংহার হলো, অতিরিক্ত কারাবন্দিত্ব অপরাধ দমনের কার্যকর উপায় নয়, বরং গবেষণা নির্দেশ করে যে প্রমাণভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, কার্যকর বিচার এবং সামাজিক বিনিয়োগ জননিরাপত্তা বৃদ্ধিতে অধিক ফলপ্রসূ (নাজগোল ঘান্ডনুশ অ্যান্ড সাবরিনা সি. পিয়ার্স, আমেরিকাস ইনকারসারেশন ক্রসরোডস: রিভার্সিং প্রগ্রেস অ্যামিড রেকর্ড-লো ক্রাইম রেটস, ওয়াশিংটন, ডিসি: দ্য সেন্টেন্সিং প্রজেক্ট, ২০২৫)।
অন্যদিকে নরওয়ে ও জাপানের মতো দেশগুলোতে তুলনামূলক কম দণ্ডমূলক এবং অধিক পুনর্বাসনভিত্তিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। নরওয়েতে পুনরায় অপরাধে জড়ানোর হার প্রায় ২০ শতাংশের কাছাকাছি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে অনেক গবেষণায় তা ৬০-৭০ শতাংশেরও বেশি পাওয়া গেছে (ফার্স্ট স্টেপ অ্যালায়েন্স, “রিহ্যাবিলিটেশন লেসনস ফ্রম নরওয়েজ প্রিজন সিস্টেম,” ২০২৪; কামিকা প্যাটেল, “দ্য নরওয়েজিয়ান এক্সাম্পল,” উইসকনসিন হিউম্যানিটিজ, ২০২৩)। একইভাবে জাপানে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মূলভিত্তি শাস্তির কঠোরতা নয়, বরং আইন প্রয়োগের নিশ্চিততা, দ্রুত তদন্ত এবং উচ্চ নিষ্পত্তির হার। জাপানের নিম্ন অপরাধহার মূলত সামাজিক শৃঙ্খলা, সাংস্কৃতিক সংহতি, কম বৈষম্য এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের সঙ্গে সম্পর্কিত (লোগান সিক্রেস্ট, “দ্য হিডেন ট্রেড-অফস অব জাপানস ক্রাইম-ফ্রি সোসাইটি,” আর স্ট্রিট ইনস্টিটিউট, নভেম্বর ২৬, ২০২৪)।
বাংলাদেশের বাস্তবতায়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। ফলে অনেক আসামি দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার সুযোগে জামিনে মুক্ত হয়ে যায়। এইচআরএসএস মানবাধিকার সংগঠনের বিবৃতি অনুযায়ী, “২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ৫৮০ জন শিশু ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে” (বিবিসি, মে ২১, ২০২৬)। এগুলো কোনও বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং আমাদের নৈতিক সংস্কৃতির গভীর সংকটের লক্ষণ। শুধু কঠোর শাস্তি ঘোষণা করলেই অপরাধ কমে না—যদি বিচার দ্রুত না হয়, তদন্ত নিরপেক্ষ না হয়, এবং অপরাধীর রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় তাকে রক্ষা করে।
সমকালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ২০২০ সালে তৎকালীন সরকার আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করে। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত ১ লাখ ৫১ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন ছিল, যার মধ্যে প্রায় ৩৩ হাজার মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। একসঙ্গে ২০ হাজারের বেশি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। ফলে কঠোর শাস্তির বিধান থাকা সত্ত্বেও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও শাস্তির অনিশ্চয়তা অপরাধ দমনের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে (সমকাল, মার্চ ১৪, ২০২৫)।
ওপরের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ধর্ষণ নির্মূল করতে হলে কঠোর শাস্তির চেয়ে বেশি জরুরি দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে অনেক সময় অপরাধের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। ধর্ষণ বা হত্যার ঘটনার পর কিছু দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তপ্ত থাকে, প্রতিবাদ হয়, মানববন্ধন হয়—কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ভুলে যায়। আবেগপ্রবণ জাতি হিসেবে আমরা দ্রুত উত্তেজিত হই, আবার দ্রুতই অন্য ঘটনায় মনোযোগ সরিয়ে ফেলি। ভুক্তভোগীর মানসিক ট্রমা, একটি শিশুর আজীবনের ক্ষত, কিংবা একটি পরিবারের ধ্বংস হয়ে যাওয়া—এসব বিষয় দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্ব পায় না। অপরাধী জানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের ক্ষোভ কমে যাবে, সাক্ষীরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং একসময় ঘটনাটি মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে। এই ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।
অপরাধী যদি নিজের স্বজন, রাজনৈতিক কর্মী, প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য বা পরিচিত কেউ হয়, তখন তাকে বাঁচানোর জন্য সামাজিক শক্তি সক্রিয় হয়ে ওঠে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, রাজনৈতিক গোষ্ঠী, এমনকি কখনও স্থানীয় সমাজও অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা করে। কেউ বলে “ছেলেটার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে”, কেউ বলে “মেয়েটার ভবিষ্যতের কথা ভেবে চুপ থাকাই ভালো”। ফলে আইনের ফাঁক গলে অনেক অপরাধী বেরিয়ে যায়। কালের আবর্তে তারা বিয়ে করে, সংসার গড়ে, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানুষ হয়ে ওঠে। সমাজ তাদের বয়কট করে না; বরং অনেক সময় ভুলে যায় তারা কী অপরাধ করেছিল।
এই সামাজিক বিস্মৃতি এবং অপরাধীকে রক্ষা করার সংস্কৃতি না বদলালে শুধু কঠোর শাস্তি দিয়েও ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন হবে। সুতরাং, বাংলাদেশের সমস্যাও মূলত শাস্তির কঠোরতা নয়; সমস্যাটি হলো—বিলম্বিত বিচার, দুর্বল তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব এবং শাস্তির অনিশ্চয়তা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি যতদিন থাকবে, ততদিন মৃত্যুদণ্ডের ভয়ও অপরাধ পুরোপুরি থামাতে পারবে না।
প্রকাশ্য বেত্রাঘাতের আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো— এটি আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রাষ্ট্র যখন প্রকাশ্যে সহিংসতা প্রদর্শন করে, তখন সমাজ সহিংসতাকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে শেখে। আজ সেই সহিংসতা ধর্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। কাল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। পরশু ভিন্নমতাবলম্বীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের বৈধতা সবসময় এমনভাবেই বিস্তৃত হয়েছে। আইন-শাসনের মূল উদ্দেশ্যই হলো রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর সীমা আরোপ করা, জনতার ক্ষণিক আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সকল নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা।
ড. আসিফ নজরুলের লেখাটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ সম্ভবত এই দাবি যে শাস্তি এমন হওয়া উচিত যাতে “মানুষের মনে কিছুটা শান্তি আসে।” বিচারব্যবস্থার লক্ষ্য জনতার মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করা নয়; বিচারব্যবস্থার লক্ষ্য ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। যদি জনতার সন্তুষ্টি বিচারব্যবস্থার মানদণ্ড হয়ে যায়, তাহলে আমরা খুব দ্রুত রুল অব ল থেকে সরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠিত মব জাস্টিসে থেকে যাবো।
অনেকে মনে করতে পারেন যে আমি ধর্ষকের পক্ষে কথা বলছি। বস্তুত, আমি ধর্ষকের অধিকার রক্ষার জন্য নয়, রাষ্ট্রের সীমা নির্ধারণের জন্য যুক্তি দিচ্ছি। রাষ্ট্র যদি আজ ধর্ষককে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত করতে পারে, তাহলে কাল অন্য অপরাধী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতাবলম্বীর ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করতে পারে।
আমরা অবশ্যই চাই রামিসার হত্যাকারীসহ সব হত্যাকারী এবং ধর্ষকের দ্রুত বিচার হোক। আমরা চাই, অপরাধী অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি পাক। তবে সেই শাস্তির ধরন নির্ধারিত হবে আইনের শাসন, প্রমাণ এবং ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে—জনতার ক্রোধের তীব্রতায় নয়। আমরা চাই না মধ্যযুগীয় প্রদর্শনমূলক শাস্তিকে আধুনিক বিচারব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হোক। কারণ একটি সভ্য সমাজের শক্তি তার প্রতিশোধস্পৃহায় নয়, তার ন্যায়বিচারে। আর সেই ন্যায়বিচার কখনও জনতার আবেগ বা ক্ষোভের কাছে আত্মসমর্পণ করে না।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং
পিএইচডি ক্যান্ডিডেট, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিও, কানাডা
