নিজস্ব প্রতিনিধি :স্বাধীন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে গড়া বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের তৎকালীন ‘মুজিব বাহিনী’র প্রধান ও জাসদের সাবেক জেলা সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনি আর নেই (ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। শুক্রবার (১২ জুন) ভোর সাড়ে ৬টার দিকে যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
মৃত্যুকালে কিংবদন্তিতুল্য এই লড়াকু প্রবীণ রাজনীতিবিদের বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। হাসপাতাল ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে হার্ট, কিডনি, শ্বাস-প্রশ্বাসের তীব্র সমস্যাসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছিলেন। এর আগে গত সোমবার তীব্র অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে পুনরায় যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে মঙ্গলবার রাতেই চিকিৎসকেরা তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে স্থানান্তরিত করেন।
শুক্রবার সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে যশোরের সর্বস্তরের মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের মাঝে গভীর শোকের আবহ তৈরি হয়। তাঁর মরদেহ শহরের রেল বাজারের নিজ বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানাতে সেখানে ছুটে যান।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়ে যাওয়া এই বীর মুক্তিযোদ্ধা গত ১২ মে তাঁর বাসভবনে প্রথম দফায় মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সে সময় তাঁকে যশোর জেনারেল হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য যশোর সদর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সার্বিক তদারকি ও ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় আলী হোসেন মনিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসা শেষে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তাঁকে পুনরায় যশোরে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর আবারও অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে শেষবারের মতো হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।
বৃহত্তর যশোরের মুজিব বাহিনীর উপ-প্রধান ও প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম গভীর শোক প্রকাশ করে জানান, আলী হোসেন মনির সহধর্মিণী এবং একমাত্র ছেলে রাজেন আলী রাজু বেশ আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। বাবার এই শেষ সময়ে প্রবাস জীবন ফেলে দেশে ফিরে চিকিৎসা ও সেবা-শুশ্রূষার মূল দেখভাল করছিলেন তাঁর কানাডা প্রবাসী একমাত্র মেয়ে ফারজানা আলী। শুক্রবার আসর নামাজ বাদ যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাঁ মাঠে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর বিশেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হবে এবং জানাজা শেষে সদরের কাজীপুরে তাঁর পারিবারিক কবরস্থানে মরহুমকে দাফন করা হবে।
আলী হোসেন মনি ১৯২৭ সালের ১৭ জানুয়ারি যশোর সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের কাজীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যশোর মুসলিম একাডেমি থেকে মাধ্যমিক (এসএসসি), ঐতিহ্যবাহী সরকারি এম এম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) এবং পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
ষাটের দশকে ছাত্ররাজনীতির সোনালী সময়ে তিনি তৎকালীন অবিভক্ত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের অত্যন্ত প্রভাবশালী সহ-সভাপতি ছিলেন। বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান এবং তৎকালীন স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে প্রতিটি স্বাধিকার আন্দোলনের রাজপথের প্রধান সংগঠক ছিলেন তিনি।
৭১-এর অগ্নিঝরা দিনগুলোতে স্বাধীনতাকামী এই তরুণ ভারতের দেরাদুনে মুজিব বাহিনীর প্রথম ব্যাচের উচ্চতর সামরিক ও guerrilla ট্রেনিংয়ে অংশ নেন। ট্রেনিং শেষে বৃহত্তর যশোর অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে মুজিব বাহিনীর প্রধান হিসেবে বীরত্বের সাথে নেতৃত্ব দেন। দেশ স্বাধীনের পর সমাজতান্ত্রিক চেতনার জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) প্রতিষ্ঠায় তিনি অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং দীর্ঘদিন জেলা জাসদের সভাপতির দায়িত্ব সামলান।
পরবর্তীতে দলের ঐতিহাসিক বিভক্তির পর তিনি জাসদের (ইনু) জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং সর্বশেষ ১৯৯৭ সালে বিভক্ত জাসদ ঐক্যবদ্ধ হলে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পতাকাতলে যুক্ত হন। জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদে না থাকলেও প্রতিটি নির্বাচনে দলটির পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণার মূল চালিকাশক্তি ও অভিভাবক হিসেবে কাজ করতেন এই লড়াকু সৈনিক। প্রবীণ এই বীর মুক্তিযোদ্ধার মহাপ্রয়াণে যশোরের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।
