নিজস্ব প্রতিনিধি : গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুরু হওয়া ‘মব সন্ত্রাস’ শিক্ষাগুরুদের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত তিন মাসে মব হামলার শিকার হয়ে শারীরিক ও মানসিক আঘাতে এ পর্যন্ত ছয়জন শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া আরও পাঁচ শতাধিক শিক্ষক হামলায় আহত বা গুরুতর অসুস্থ হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পরিকল্পিত এই মব সংস্কৃতির জেরে অসংখ্য শিক্ষক স্ট্রোক করে চিরতরে কর্মক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া শাহজাহানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিমের ঘটনাটি এই ভয়াবহতার এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। গত ৪ ফেব্রুয়ারি (২০২৫) একদল বহিরাগত যুবক তাঁকে নিজ কক্ষে অবরুদ্ধ করে পদত্যাগের জন্য চরম চাপ সৃষ্টি করে।
ঘটনার সচিত্র বর্ণনা ফেসবুকে লাইভ করা হয়। তীব্র ভয়ের মুখে তিনি শ্রেণিকক্ষেই স্ট্রোক করে অচেতন হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তিনি জানান, এই মানসিক ট্রমা তিনি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ঘটনার পর মামলা হলেও স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
একই চিত্র দেখা গেছে কিশোরগঞ্জের আরজত আতরজান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুবকর সিদ্দিকের ক্ষেত্রে।
গত ৪ সেপ্টেম্বর (২০২৪) প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক ইন্ধনে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষার্থীদের তাঁর বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া হয়। প্রধান শিক্ষকের বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হলে তিনি আত্মগোপনে যান এবং সেখানে স্ট্রোক করে দুই সপ্তাহ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
যদিও তদন্ত কমিটি তাঁর বিরুদ্ধে আনীত ১৯টি অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি এবং ২৯ অক্টোবর তাঁকে পুনর্বহাল করা হয়েছে, তবুও এই অমানবিক হয়রানির ক্ষত এখনো বহন করছেন তিনি।
শরীয়তপুরের কোদালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. বিল্লাল হোসেন মৃধার ঘটনাটিও কম ভয়াবহ নয়। শিক্ষার্থীদের একটি অরাজনৈতিক আন্দোলনকে পুঁজি করে স্থানীয় একটি স্বার্থান্বেষী পক্ষ তাঁকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করে।
পদত্যাগের প্রচণ্ড মানসিক চাপে তিনিও স্ট্রোক করেন। যদিও বর্তমানে তিনি চাকরিতে ফিরেছেন, কিন্তু ঘটনার ভয়াবহ স্মৃতি এবং পুনরায় লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়ে তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
শিক্ষাবিদদের মতে, কেবল ব্যক্তিগত আক্রোশ, পরিচালনা কমিটির নির্বাচন বা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের লক্ষ্যে শিক্ষকদের টার্গেট করা হচ্ছে। মব বাহিনী ব্যবহার করে শিক্ষকদের এভাবে পদত্যাগে বাধ্য করা বা শারীরিক নির্যাতন কোনোভাবেই আইনসিদ্ধ নয়।
তদন্ত কমিটি কর্তৃক অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পরও শিক্ষকদের যে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে, তা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য লজ্জাজনক। এ ধরনের অরাজকতা বন্ধে এবং মব সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
