নিজস্ব প্রতিনিধি :
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি ছিল দীর্ঘ ২৩ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলন ও সুপরিকল্পিত প্রস্তুতির ফসল। সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্য ও জাতীয় কিংস পার্টির নেতা নাহিদুল ইসলাম ‘মুজিব বাহিনী’র অবদান নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা নতুন করে ইতিহাসের এক চিরন্তন সত্যকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদদের গড়া সেই দুর্ধর্ষ ‘বিএলএফ’ বা মুজিব বাহিনী না থাকলে বাংলাদেশ কি আদৌ স্বাধীন হতো? ।
মুক্তিযুদ্ধের সামরিক ভিত্তির কাজ শুরু হয়েছিল যুদ্ধের ঠিক নয় বছর আগে, ১৯৬২ সালে। ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খান, কাজী আরেফ আহমেদ ও আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ‘নিউক্লিয়াস’। যখন এই ভূখণ্ডের অধিকাংশ মানুষ স্বায়ত্ত্বশাসনের কথা ভাবছে, তখন এই তরুণেরা অস্ত্র হাতে পূর্ণ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছিলেন। ১৯৬৪ সালে পুরান ঢাকার দাস লেনে সাইকোস্টাইল মেশিনের মাধ্যমে ‘জয় বাংলা’ ও ‘স্বাধীনতার ইশতেহার’ প্রচারের যে দুঃসাহস তাঁরা দেখিয়েছিলেন, তা-ই ছিল মুক্তিযুদ্ধের বীজ। ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় জেনারেল এম এ জি ওসমানীর নেতৃত্বাধীন নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি একটি বিশেষ গেরিলা বাহিনী কাজ করত, যার নাম ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’ বা বিএলএফ। ভারতের দেরাদুনে জেনারেল এস. এস. উবানের অধীনে এই বাহিনীর সদস্যরা বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতেন। এই বাহিনীর চার প্রধান—সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ—বঙ্গবন্ধুর সরাসরি নির্দেশে দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। বিএলএফ-এর ২২৩টি থানাভিত্তিক নেটওয়ার্কই মূলত পাকবাহিনীর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। ।
নাহিদুল ইসলামের মতো বর্তমান প্রজন্মের অনেকে দাবি করছেন যে, মুজিব বাহিনী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু ভারতের স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল এস. এস. উবান তাঁর ‘ফ্যান্টমস্ অব চিটাগাং’ গ্রন্থে এই বাহিনীর অবদানের কথা বিস্তারিত লিখেছেন। তৎকালীন ছাত্রনেতারা ২রা মার্চ পতাকা উত্তোলন, ৩রা মার্চ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ এবং জাতীয় সংগীত নির্বাচনের মাধ্যমে যে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন, সেটিই ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে শক্তি জুগিয়েছিল। ।
মুক্তিযুদ্ধ কেবল ৯ মাসের একটি হলিউড অ্যাকশন মুভি নয়; এটি ছিল সাড়ে সাত কোটি বাঙালির দীর্ঘ ২৩ বছরের রক্ত ও ত্যাগের ইতিহাস। এই লড়াইয়ে ছাত্রলীগের অন্তত ১৭ হাজার নেতাকর্মী জীবন দিয়েছেন। ১৯৬৬ সালের ৬-দফার পক্ষে জনমত গঠন থেকে শুরু করে ‘পিণ্ডি না ঢাকা—ঢাকা ঢাকা’ স্লোগান তুলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জোয়ার তৈরি করা পর্যন্ত সবকিছুই ছিল এই ছাত্রনেতাদের সুপরিকল্পিত কাজ। ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর থেকে বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস বিকৃতির এক গোয়েবলসীয় প্রোপাগান্ডা শুরু হয়। খন্দকার মোশতাক ও জিয়াউর রহমানের শাসনকাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত মুজিব বাহিনী ও নিউক্লিয়াসের অবদানকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্যগুলো ঘাটলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মুজিব বাহিনী ছিল স্বাধীনতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ।
ইতিহাসের কোনো একটি পাতাকে অস্বীকার করার অর্থ হচ্ছে সামগ্রিক মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা। ‘নিউক্লিয়াস’ বা ‘মুজিব বাহিনী’র ত্যাগ ও অবদানকে খাটো করে দেখা স্রেফ রাজনৈতিক সংকীর্ণতা নয়, বরং তা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানানো এখন সময়ের দাবি, যাতে কোনো রাজনৈতিক অপকৌশল আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জনের গৌরবকে ম্লান করতে না পারে।
