সৈয়দা রাজিয়া মোস্তফা, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগ
বাংলাদেশের স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রতীক ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার। গত ৭ এপ্রিল ভোররাতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে।
ওই দিন দুপুরে তাকে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলন পরবর্তী পরিস্থিতিতে তার গ্রেফতার ও কারাদণ্ড (জেলে প্রেরণ) বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। গ্রেফতারের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন সহিংসতা, হত্যা ও হত্যাচেষ্টা।
বিশেষ করে, রাজধানীর লালবাগ থানার একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় এবং রংপুরে একটি হত্যা মামলায় তিনি অন্যতম অভিযুক্ত। মামলার তদন্তকারীরা তাকে আন্দোলনের সময় সহিংসতা ও নিরপরাধ মানুষের ওপর গুলিবর্ষণের পরিকল্পনাকারী হিসেবে গণ্য করছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তিনি দেড় বছরেরও বেশি সময় আত্মগোপনে ছিলেন বলে তদন্তকারীরা বলছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ২৭ দিনের মাথায় স্পিকার পদ থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরী সরে দাঁড়ান বলে জানিয়েছিলেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।
এরপর গত দেড় বছরে তাকে আর প্রকাশ্যে আসতে দেখা যায়নি। এই সময়ের মধ্যে তার অবস্থান নিয়ে নানান গুঞ্জন শোনা গেছে। আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের পাঁচই আগস্ট ভারতে আশ্রয় নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাণহানির আশঙ্কায় সেসময় অনেকে বিভিন্ন সেনানিবাসেও আশ্রয় নিয়েছিলেন। তখন ছয় শতাধিক ব্যক্তিকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা, বিচারক, আমলা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যরা ছিলেন বলে ২০২৪ সালের ১৮ অগাস্ট প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে ও আইন বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে জীবন রক্ষা করতেই তাদেরকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল বলে আইএসপিআরের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। ২২ মে সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের নামের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেই তালিকায় শিরীন শারমিন চৌধুরীর নামও ছিল।
সেখান থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর সপরিবারে ঢাকা সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর শিরীন শারমিন চৌধুরী রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান বলে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়। তিনি কতদিন সেনানিবাসে ছিলেন এবং কবে বের হন, সে বিষয়েও আইএসপিআরের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
প্রায় দেড় বছর পর হঠাৎ ঢাকার ধানমন্ডির বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার হয়েছেন বলে জানায় পুলিশ। তার এই গ্রেফতার এবং কারাগারে প্রেরণ নিয়ে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে সমালোচনার ঝড় বইছে। প্রশ্ন উঠছে, সেনা হেফাজতে থাকা ব্যক্তি কবে, কিভাবে মুক্তি পেলেন, পরে কার হেফাজতে নিরাপদে ধানমন্ডির মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় উঠলেন, কেনই বা এখন গ্রেফতার- এই প্রশ্ন এখন জনমনে।
অনেকের দাবি, সরকারের নজরদারিতে থাকার পরও ত্রয়োদশ সংসদের এমপিদের শপথ পড়ানোর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থেকে তাকে কেন বিরত রাখা হলো।
রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ১২ মার্চ ২০২৬-এ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শপথ এবং নতুন স্পিকার হিসেবে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের দায়িত্ব গ্রহণের পেছনে প্রধান সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কারণগুলো হলো ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর পদত্যাগ, দ্বাদশ সংসদের বিলুপ্তি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি। আরও বলা হয়, ৫ আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করা হয়েছিল, যার ফলে সাবেক স্পিকারের কার্যকাল সাংবিধানিকভাবে শেষ হয়ে গিয়েছিল।
দেখানো হয়, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে নতুন স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত নিয়ম অনুযায়ী প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বরত ব্যক্তির অধীনে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন এবং শপথ গ্রহণ করেন। অর্থাৎ সহজ আইনি ব্যাখা দেওয়া হয়, পদত্যাগের পর শিরীন শারমিন চৌধুরী বিভিন্ন মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হন এবং ডিবি হেফাজতে ছিলেন, যা তাকে নতুন করে স্পিকারের দায়িত্ব পালনে অযোগ্য বা অনুপযুক্ত।
সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের এই ধরনের পদক্ষেপ কতটা যুক্তিযুক্ত তা সংবিধান লংঘনের অন্যান্য অধ্যায়ের মতো ভবিষ্যতের কাছে রেখে দিলাম। কিন্তু যেসব মামলায় জেলে প্রেরণ করা হলো সেসব মামলার ভিত্তি কতটা বাস্তব সেই প্রশ্নও ভবিষ্যত মূল্যায়ন করবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিরীন শারমিন চৌধুরী একটি পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ নাম। দেশের প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে তিনি শুধু একটি সাংবিধানিক পদ অলংকৃত করেননি, বরং দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার রাজনৈতিক পথচলা, নেতৃত্বের ধরন এবং সাম্প্রতিক গ্রেফতার-কারাবরণের ঘটনা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নানা প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। তার রাজনৈতিক উত্থান মূলত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর মাধ্যমে। আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে দলের আস্থাভাজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে তার সংসদে প্রবেশ, পরে প্রতিমন্ত্রী এবং সর্বশেষ স্পিকার পদে দায়িত্ব গ্রহণ- এই ধারাবাহিকতা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের স্থিতিশীলতা ও নেতৃত্বগুণের পরিচায়ক। স্পিকার হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের সময়কালটি ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা, বিরোধী দল ও সরকারি দলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও তিনি ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে তার গ্রেফতার ও কারাবরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি পুরনো বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে আসে- ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন নজির নতুন নয়। বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার ও কারাবরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথা মহান সংসদের স্পিকারের ক্ষেত্রে এই ধরনের দৃষ্টান্ত নেই। ফলে শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেফতারের ঘটনাটিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ কিভাবে হয়- এই প্রশ্নটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনের শাসন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হয়, তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়ায়। একজন সাবেক স্পিকার হিসেবে তার ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি আরও বেশি গুরুত্ব পায়।
অন্যদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একজন নারী নেতা হিসেবে শিরীন শারমিন চৌধুরীর উত্থান অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস ছিল। তার এই পরিস্থিতি নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে কিনা-সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে।
রাজনীতির বাস্তবতায় ব্যক্তির অবস্থান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা অটুট থাকা জরুরি। সংসদ, বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসন- এই তিনটি স্তম্ভের ওপরই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে। যদি এই প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করতে না পারে, তাহলে জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমি মনে করি, শিরীন শারমিন চৌধুরীর রাজনীতি ও তার গ্রেফতার-কারাবরণের ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক চর্চার একটি প্রতিচ্ছবি। এই ঘটনার সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ সমাধানই পারে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে। তবে মূল প্রশ্নটি এখানেই- আইনি প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত? যদি জনগণের একটি বড় অংশ মনে করে যে বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তাহলে সেই প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। আর এ ধরনের সন্দেহই ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’ কথাটিকে বারবার সামনে নিয়ে আসে। যা ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর এই গ্রেফতারের বেলায়ও প্রযোজ্য।
