নাসরীন সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শরিয়া আইন নিয়ে আমি আপাতত মাথা ঘামাচ্ছি না। কারণ, এ দেশে এটা বাস্তবায়ন হওয়া ততটাও সহজ হবে না। মোটামুটি তাদের আরও দুই দশক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
তবে আমি একটি বিষয়ে সত্যি চিন্তিত, আর সেটি হলো কারিকুলামে reproductive health care অন্তর্ভুক্ত করা। আমি দেখলাম অনেক উচ্চশিক্ষিত এবং প্রগতিশীল ব্যক্তি এটা পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন। আমার মতে, এটি একটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পরামর্শ।
প্রথম কথা হলো, গত কয়েক মাসের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখুন কারা ভুক্তভোগী হচ্ছে। বেশিরভাগই শিশু, যারা কৈশোরে পা রাখেনি। শিশুর পাঠক্রমে কোনো অবস্থাতেই reproductive health রাখা যাবে না। না মানে না।
দ্বিতীয়ত, reproductive health সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণিতে রাখা যেতে পারে। তবে ভাষার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। এই অধ্যায় লেখার ক্ষেত্রে একজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ ফিজিওলজিস্ট, সাইকোলজিস্ট, এথিসিস্ট এবং সমাজবিজ্ঞানীর যৌথ সমন্বয় ঘটাতে হবে। কাজটি খুব সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে। প্রতিটি শব্দচয়ন সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে। কারণ, বয়সটাও ঝুঁকিপূর্ণ। সেই সঙ্গে স্কুলে এই অধ্যায় পড়ানোর জন্য বিশেষ শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। পড়ানোর আগে অভিভাবকদের অনুমতি নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই বিষয়ে কোনো পরীক্ষা নেওয়া যাবে না।
কেন আমি এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছি, তার কারণ আছে। এই বয়সে, অর্থাৎ বয়ঃসন্ধিকালে, ছেলেমেয়েরা খুব কৌতূহলী থাকে। এই বয়সে তারা গল্পের বই পড়তে শেখে। তাদের reproductive health পড়ানো হলে অনেকের মধ্যে explore করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। সুতরাং, এই ধরনের সিদ্ধান্ত হুটহাট করে নেওয়া যাবে না।
ধর্ষণের এই পর্যায়ে যাওয়ার পেছনে অনেকগুলো কারণ আছে। সবচেয়ে বেশি দরকার সচেতনতা এবং সামাজিক শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া। অন্যের জিনিস যেমন না বলে নেওয়া যায় না, তেমনি অন্যের গায়ে অনুমতি ছাড়া হাত দেওয়া অপরাধ—এটা প্রথম শ্রেণি থেকেই শিক্ষা দিতে হবে। বাবার মতো, চাচার মতো, ভাইয়ের মতো—এসব জ্ঞাতি সম্পর্ক পাতানো একদম বন্ধ করতে হবে।
রামিসার বাবাকে দেখলাম অন্যের মেয়েদের চুমু দিচ্ছেন, সিমরান লুবাবাকে মাথায় হাত দিয়ে আদর করে দিচ্ছেন। কন্যাশোকে দেশের সব কন্যাকে নিজের কন্যা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। হোক সে কন্যাসন্তান কিংবা পুত্রসন্তান, অন্যের সন্তান নাবালক হলে মা-বাবার অনুমতি ছাড়া তাদের কোলে নেওয়া বা আদর করা একদম ঘৃণার চোখে দেখতে হবে। আর সাবালক হলে অনুমতি, অর্থাৎ consent, অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের বাথরুমে যৌন নির্যাতনের বিষয়ে সুস্পষ্ট লিখিত নীতিমালা টানিয়ে দিতে হবে, যাতে করে বাথরুমে ঢোকা মাত্র প্রতিদিন অন্তত একবার মগজে ঢোকে কোনটা অপরাধ এবং কোনটা বৈধ কাজ।
আরও একটি বিষয় আছে। অনলাইন-অফলাইনে গালাগালির অভিধান থেকে মা তুলে গালি দেওয়া বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে একটি ব্যাপক সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করতে হবে। নারী দুর্বল বলে কারও প্রতি ক্ষোভ হলে তার মাকে দায়ী করে গালি দেওয়া হয়। বাবা পুরুষ বলে তাকে গালি দিতে ভয় লাগে।
হাদীমাদীর গালাগালি বর্তমানে একটি প্রজন্মকে মারাত্মকভাবে বিপথগামী করেছে। মিছিলের স্লোগান এত অশ্লীল হলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনস্তত্ত্বে এটি কাজ করে। গত কয়েক মাসের যতগুলো ধর্ষণ এবং খুন হয়েছে, সেগুলোর সবগুলোতেই ভুক্তভোগীর যৌনাঙ্গে মারাত্মক জখমের আলামত ছিল। অপরাধীকে অবশ্যই এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত। তারা কেন এই কাজ করেছে, সেটা তদন্ত হওয়া দরকার, যাতে ভবিষ্যতে এমন না হয়।
ধর্ষণের ক্ষেত্রে আমি মৃত্যুদণ্ডের বিধানের পক্ষে নই। এই শাস্তি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। শাস্তির উদ্দেশ্য কেবল প্রতিশোধ নয় বরং প্রতিরোধও। Bentham-এর মতে, মানুষ সুখ লাভ ও কষ্ট এড়ানোর হিসাব করে কাজ করে। তাই শাস্তি এমন হওয়া উচিত যাতে অপরাধ করার সম্ভাব্য লাভের চেয়ে শাস্তির কষ্ট বেশি মনে হয়। এই অর্থে তিনি মনে করতেন যে শাস্তির ভয় অপরাধ প্রতিরোধ করতে পারে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। Bentham মনে করেন না যে “যত কঠোর শাস্তি, তত ভালো”। বরং তিনি বলেছিলেন: “All punishment in itself is evil.”
(প্রত্যেক শাস্তিই নিজেই একটি অমঙ্গল।)
তাই শাস্তি কেবল তখনই ন্যায্য, যখন তা আরও বড় ক্ষতি (অপরাধ) প্রতিরোধ করে। তিনি অপ্রয়োজনীয় কঠোরতার বিরোধী ছিলেন।
অন্যদিকে, Cesare Beccaria আরও স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে: অপরাধ কমাতে শাস্তির কঠোরতার চেয়ে নিশ্চিয়তা (certainty) বেশি কার্যকর। অর্থাৎ Beccaria-এর মতে: ১০০% নিশ্চিত ৫ বছরের জেল, ১০% সম্ভাবনার মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে বেশি প্রতিরোধমূলক হতে পারে।
ধর্ষণের পরে কেন বাচ্চারা খুন হয়, সেটি আসামিকে জেরা করে বের করা হোক। এটি একটি ভালো গবেষণার বিষয় হতে পারে। পারভার্শন থেকে খুন করে, নাকি ধর্ষণের কথা অন্য কেউ না জানে সেই জন্য খুন করে—সেটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে হবে। প্রতিটি ধর্ষককে জেলখানায় মনিটর করা হোক। তাদের মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা হোক। এমনও হতে পারে, প্রধান উদ্দেশ্য খুন করা ছিল, আর ধর্ষণ একটি বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে কাজ করেছে।
সমাজে বিবাহের নিয়ম শিথিল করা হোক। একশ লোকের বরযাত্রী, লাখ টাকার দেনমোহর, সোনাদানা, ভারী গহনা কিনতে গিয়ে মানুষের মৌলিক চাহিদার বিষয়টি অত্যন্ত গৌণ হয়ে যাচ্ছে; বরং শো-অফ প্রাধান্য পাচ্ছে। সেই সঙ্গে বিবাহের ক্ষেত্রে মেয়েদের পুরুষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বিলম্বিত বিবাহের অন্যতম কারণ। আমাদের সমাজে অনেক পুরুষকে স্ত্রীর পাশাপাশি শ্বশুরবাড়ির লোকজনের দায়িত্ব নিতে হয়, বাজার করে মান-সম্মান রক্ষা করতে হয়। এগুলো খুব ছোট ঘটনা মনে হলেও মোটেও ছোট নয়। দীর্ঘমেয়াদে এসব বিবাহকে বিলম্বিত করে।
সন্তান জন্মদানের পর নারীরা নিজেদের প্রতি উদাসীন হয়ে যায়। নিজেদের সৌন্দর্যের দিকে নজর দেয় না। সঙ্গীর পছন্দের প্রতিও মনোযোগী থাকে না। সমস্ত চিন্তা সন্তানকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। ফলে অনেক পুরুষ সঙ্গীর প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। বিবাহ কোনো জন্মজন্মান্তরের সম্পর্ক নয়; এটি একটি চুক্তি। সুতরাং, সন্তানের দোহাই দিয়ে সঙ্গীর পছন্দকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
আশা করি বোঝাতে পেরেছি।
