নিজস্ব প্রতিনিধি
বর্তমান বিএনপি সরকারের শাসনামলে জ্বালানি খাতের লুটপাট ও অনিয়ম যেন সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। কোনো ধরনের দরপত্র বা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই রহস্যজনকভাবে দুটি বিদেশি কোম্পানিকে ২ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের কাজ দিয়েছে সরকার। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অন্ধকার পথে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি ও অর্থ পাচারের যোগসূত্র রয়েছে বলে তীব্র সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাজ পাওয়া কোম্পানিগুলোর একটি হলো যুক্তরাজ্যের K&R International Trading (UK) Ltd। ব্রিটেনের ‘কোম্পানিজ হাউস’ (Companies House)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানের বয়স মাত্র ১৪ মাস। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, কোম্পানিটি নিবন্ধিত হয়েছে ‘আইটি কনসালট্যান্সি ও ইঞ্জিনিয়ারিং পরামর্শ’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে, যার সাথে জ্বালানি ব্যবসার দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।
আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, এই কোম্পানির জন্য ব্যবহৃত অফিসের ঠিকানাটি মূলত একটি ভার্চুয়াল ঠিকানা। বাস্তবে সেখানে কোনো কার্যালয় বা কর্মচারী নেই। সাধারণত জালিয়াতি, মানি লন্ডারিং এবং স্ক্যাম পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত ‘শেল কোম্পানি’গুলো এ ধরনের ঠিকানা ব্যবহার করে থাকে। এমন একটি অদক্ষ ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানকে হাজার হাজার কোটি টাকার জ্বালানি আমদানির কাজ দেওয়া সরকারের সরাসরি দুর্নীতি ও অদূরদর্শিতারই প্রমাণ।
জানা গেছে, ডিজেল সরবরাহের জন্য তিনটি প্রস্তাব ছিল। তৃতীয়টি ছিল দেশীয় প্রতিষ্ঠান সিকদার ইন্টারন্যাশনাল। কিন্তু ডলার সংকটের অজুহাতে এবং ‘পারফরম্যান্স গ্যারান্টি’ দিতে পারবে না এমন ঠুনকো যুক্তি দেখিয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠানটিকে বাদ দেওয়া হয়। অথচ যাদের কাজ দেওয়া হয়েছে, তাদের একজনের বয়স মাত্র ১৪ মাস এবং অন্যটিরও জ্বালানি খাতে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। অভিজ্ঞ দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে হটিয়ে অখ্যাত বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার পেছনে সরকারের নীতিনির্ধারকদের ‘বিশেষ স্বার্থ’ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের পরপরই আনুষ্ঠানিক সভা হওয়ার কথা থাকলেও সেদিন তা অনুষ্ঠিত হয়নি। কেন এই সভা স্থগিত হলো, সে বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসা করা হলেও তারা মুখে কুলুপ এঁটেছেন। এমনকি জ্বালানি সচিব এবং মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের সাথে যোগাযোগ করেও কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। সরকারের এই ‘গোপনীয়তা’ এবং দায়িত্বশীলদের ‘পালিয়ে বেড়ানোর’ সংস্কৃতি প্রমাণ করে যে, এই চুক্তির আড়ালে বিশাল অংকের আর্থিক লেনদেন ও অনিয়ম ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
দেশের অর্থনৈতিক সংকটের এই দুঃসময়ে যেখানে সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট। সেখানে সরকার একচ্ছত্র ক্ষমতার দাপটে টেন্ডার ছাড়াই এ ধরনের ভয়াবহ চুক্তি করে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি ক্রাইসিসকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আড়ালে থাকা কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পকেট ভারী করছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাহীন এই শাসন ব্যবস্থায় তল্পিবাহক আমলা ও অখ্যাত কোম্পানির এই আঁতাত দেশের অর্থনীতিকে দেউলিয়া হওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিনা টেন্ডারে এবং অভিজ্ঞতাহীন প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি আমদানির কাজ দেওয়া কেবল রাজনৈতিক অনৈতিকতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের এক মহোৎসব। অবিলম্বে এই অস্বচ্ছ চুক্তি বাতিল করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে।
