আনিস আলমগীর
সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ডিসেম্বর মাসজুড়ে আমার রিলগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের গান ব্যবহার করব। ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। এসব গানে অসন্তুষ্ট হওয়ার কথা ছিল পাকিস্তানিদের, কিন্তু জ্বলে উঠেছিল তাদের রেখে যাওয়া কিছু ‘উত্তরসূরি’।
১৩ ডিসেম্বর বড় ভাইকে হারালাম। পরদিন, ১৪ ডিসেম্বর- শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে- আমি গ্রেফতার হলাম। তার পরদিন ১৫ ডিসেম্বর ছিল আমার মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী, এরপর বিজয় দিবস, আর কিছুদিন পর ২৫ ডিসেম্বর চাচার মৃত্যুবার্ষিকী। ব্যক্তিগত ও জাতীয়- কোনো শোক বা আনন্দই প্রকাশ করতে পারিনি এই দিনগুলোতে। এমন অশুভ ডিসেম্বর আমার জীবনে আর আসেনি। জেলখানায় বসে দেখেছি, মবের জনক, স্বাধীনতা বিরোধীদের ‘নব্য পিতা’, বিশ্ব বাটপার ইউনূসের শাসনে মৌলবাদের উত্থান ও তাণ্ডব।
১৪ মার্চ মুক্তি পেলাম। বের হয়ে দেখলাম, স্বাধীনতার ওপর আরও বড় ধরনের আক্রমণ চলছে- মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের হত্যার দায় স্বীকার না করেই স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের ভণ্ডামি। ২৪ কে সামনে এনে ৭১ এর অপকর্ম ভুলিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা।
তবে একটি ইতিবাচক দিকও আছে- বিএনপি এখন মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনাকে আগের চেয়ে বেশি ধারণ করার চেষ্টা করছে, যদিও স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে অহেতুক বিতর্ক এখনও চলমান। সাধারণ মানুষ এখন অন্তত স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতে ইউনূসের শাসনকালের মতো ভয় পাচ্ছে না। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপিই এখন অনেকের কাছে স্বাধীনতার পক্ষে একমাত্র ভরসা- ২৬-এর নির্বাচনে তার প্রতিফলনও দেখা গেছে।
দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিলেও এখনো জেলে যেতে হয়। বঙ্গবন্ধু বা স্বাধীনতার পক্ষে কথা বললেই ‘আওয়ামী লীগ’ ট্যাগ জুড়ে দেওয়া হয়। প্রশ্ন জাগে- ‘জয় বাংলা’ কি নিষিদ্ধ কোনো শব্দ?
আওয়ামী লীগের চরিত্র খুব একটা বদলায়নি। তারা এখনো নিজেদের স্বাধীনতার একমাত্র দাবিদার মনে করে। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা যেকোনো ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান অবদানকে মূল্যায়ন করতে হবে- সে বিএনপি করুক বা অন্য যে কোনো দল। ব্যক্তি বা দলের পরিচয় নয়, একাত্তর প্রশ্নে অবদানই হওয়া উচিত মূল্যায়নের মানদণ্ড। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ সবার অবদান স্বীকার করতে হবে। কারও ভূমিকাকে খাটো না করলেই বরং আওয়ামী লীগেরই লাভ হবে।
২৪ দিয়ে একাত্তরের অপকর্ম আড়াল করতে যে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে, তা প্রতিরোধ করতে হলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ- দুই দলকেই একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দাঁড়াতে হবে। তাদের পারস্পরিক লড়াইকে আমি দেখি ক্ষমতার লড়াই হিসেবে; কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে এই লড়াই কোনোভাবেই ক্ষমতার নয়- এটি দেশের অস্তিত্বের প্রশ্ন।
স্বাধীনতার প্রশ্নে কোনো আপস নয়- এটাই হোক আমাদের চূড়ান্ত অঙ্গীকার।
