দেশে হামের ভয়াবহ সংক্রমণের পেছনে গত আট বছরের টিকাদান ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ (UNICEF) এবং বাংলাদেশের নিজস্ব সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) ঐতিহাসিক ডাটা বলছে ভিন্ন কথা। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে হামের (MR) টিকার কভারেজ ছিল সন্তোষজনক, যা হঠাৎ ২০২৫ সালে এসে বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা WUENIC-এর এস্টিমেট এবং সরকারি ইপিআই ড্যাশবোর্ড অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশে হামের টিকার কভারেজ ছিল ৯৭ শতাংশ। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই হার সামান্য কমে ৯৬ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত দেশে যখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল, তখন পর্যন্ত হার্ড ইমিউনিটি (Herd Immunity) বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত ছিল। ফলে “গত ৮ বছর টিকা দেওয়া হয়নি”– স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন দাবি দাপ্তরিক তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক।
EPI-এর বর্তমান ড্যাশবোর্ড অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এসে টিকাদানের হার হঠাৎ ৬০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে যেখানে ৯৫ শতাংশ কভারেজ জরুরি, সেখানে এই বিশাল পতনই বর্তমান মহামারির মূল কারণ। এছাড়া যক্ষ্মার (BCG) টিকার ‘লেফট-আউট রেট’ বা বাদ পড়ার হার ১৩.২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।
তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্বাস্থ্য খাতের অপারেশনাল প্ল্যান (OP) এবং সেক্টর প্রোগ্রামগুলোতে স্থবিরতা তৈরি হয়। এরপর বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাঠ পর্যায়ে জনবল সংকট, লজিস্টিক সাপোর্টের অভাব (সিরিঞ্জ ও ফান্ড) এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ২০২৪ পর্যন্ত যেখানে ৯০ শতাংশের ওপরে টিকাদান নিশ্চিত ছিল, সেখানে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে কেন এই ধস নামল— সেই প্রশ্নের উত্তর এখন খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথিতেই বন্দি।
রাজনীতিবিদেরা একে অপরের ওপর দায় চাপালেও, ডাটা বলছে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে না পারা এবং মাঠ পর্যায়ের টিকাদান ব্যবস্থাকে সচল রাখতে ব্যর্থ হওয়াই আজ শিশুদের মৃত্যুমিছিলের প্রধান কারণ।
