৫ আগস্টের পর সারাদেশে যে তাণ্ডব শুরু হয়েছিল, সেটার জন্য আমরা অনেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। ‘তুমি কে, আমি কে রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগান দিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনের পরিণতি যে জামায়াতের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর, সেটা অনুমিতই ছিল। সুতরাং আওয়ামী লীগ দমনের দোহাই দিয়ে ইউনূসের জামায়াতি সরকার শুরু থেকেই তাদের মব বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ওপর আক্রমণ শুরু করলে বিচলিত হইনি। সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো, মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ধরে মারা হলো, কাউকে কাউকে জুতার মালা পরিয়ে দেওয়া হলো। মন খারাপ হলো, কিন্তু বুদ্ধিমানরা বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই পরবর্তী যাত্রা নির্ধারণ করে। তাছাড়া ব্যক্তি হিসেবে আমার এসবে তেমন মনোযোগ দেওয়ারও সময় ছিল না। অনেকেই জানেন, ২০২২ সাল থেকেই আমার হার্টের অবস্থা একেবারেই নাজুক; সে বছর লন্ডনে বাইপাস করার পর প্রতি বছরই বছরের অর্ধেক সময় আমাকে লন্ডনে কাটাতে হয়। সপ্তাহের ৩ দিন কাটে বিছানায়, ২ দিন কাটে হাসপাতালের মনিটরের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে রেখে, আর বাকি ২ দিন যা একটু সামাজিকতা করার সুযোগ ঘটে।
কিন্তু উদ্বিগ্ন হলাম, যখন জানলাম যে ইউনূস, আসিফ নজরুলরা তাঁদের বাপদের কথায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে কোনো মূল্যে শাহরিয়ার কবির আর হাসানুল হক ইনুর ফাঁসি দেবে। গতকাল আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইঁয়া যে ‘ডিপস্টেট চেয়েছিল ৫ বছর থাকি, তারা সব রোডম্যাপ করে দিয়েছিল’ বলেছেন, সেই রোডম্যাপের প্রথমদিককার একটি সিদ্ধান্ত ছিল এটি।
সেটি সেপ্টেম্বরের ঘটনা। স্পেসিফিকভাবে ২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরের একটি মিটিংয়ের তথ্য আমাদের কয়েকজনের কাছে আসে, হাই লেভেলের মিটিং, এবং প্রায় সুপার হাই লেভেলের একজনও সেখানে অনলাইনে যুক্ত হন। সে মাসের শুরুতেই ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে যুদ্ধাপরাধীদের উকিল তাজুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কারণ শাহরিয়ার কবিরকে ফাঁসি দেওয়া সাধারণ মানুষের জন্য বিব্রতকর হতে পারে; এজন্য এমন লোক লাগবে, যে মনেপ্রাণে রাজাকারিত্ব ধারণ করে। ২৪ সেপ্টেম্বরের মিটিং, যেখানে একজন মাননীয়ও ভিডিও কলে যোগ দেন, সেখান থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে আওয়ামী লীগের যেসব নেতা আটক আছেন, বিশেষ করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক যদিও টার্গেট, কিন্তু আওয়ামী লীগারদের কিছু হলেও সেটা রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু সার্বজনীন মুক্তিযুদ্ধকে ধুয়েমুছে দিয়ে নতুন স্বাধীনতা দিবস, একাত্তরকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে চব্বিশ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা এবং রাজাকারদের পুরো মাসল পাওয়ার দেখানোর জন্য চমৎকার টার্গেট হচ্ছেন শাহরিয়ার কবির। এই লোকের টাকাপয়সা নেই যে টাকা দিয়ে কিছু ম্যানেজ করবে, লোকবল নেই। অঘোষিত প্রধান উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ব্যক্তিগত ক্ষোভ এই লোকের ওপর সোনায় সোহাগা।
ততক্ষণে মোটামুটি তারা স্বপ্ন দেখছে যে স্যারকে ৫ বছর রাখা হবে; সেই সুযোগে মাঠে ক্ষমতা সংহত করা হবে। নির্বাচন দিলেই বিএনপি চলে আসবে, সুতরাং নির্বাচন সুদূরপরাহত।
ওয়েল, এবার আমাদের কারো কারো একটু গায়ে লাগা শুরু হলো। ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা এক কথা, আর বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ পুরোপুরি অন্য লেভেলের ব্যাপার। ডিপস্টেটের মায়েরে বাপ। তখন বিচ্ছিন্নভাবে প্রচুর মানুষ অনলাইনে মুখ খোলা শুরু করেছেন। আমি এমন সব চমৎকার তরুণদের অনলাইনে দেখতে পেলাম, যারা রাজনীতির ‘র’ শব্দের সাথেও ছিল না, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ মুছে দিয়ে নতুন তামাশা তৈরির বিরুদ্ধে সোচ্চার। আমাদের মনে হলো, তাঁদের সাথে যুক্ত হওয়া দরকার।
তো, আমরা কয়েকজন একটি অনলাইন মিটিং করলাম। একেকজন একেকভাবে পরিস্থিতি দেখে। আমরা একমত হলাম যে যুদ্ধাপরাধীদের এই তাণ্ডবকে বিনা চ্যালেঞ্জে ছাড়া যাবে না। এটি একটি দীর্ঘ সংগ্রাম, এর দুটি অংশ একটি ইমিডিয়েট অ্যাক্টিভিজম, আরেকটি অংশ হচ্ছে ইন্টেলেকচুয়াল ভিত্তি। এবং সেই সংগ্রাম দাঁড়াতে হবে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে, নিজস্ব বয়ানের মধ্য দিয়ে। আপনি ইন্টেলেকচুয়াল ফাইট না দিয়ে কিছুই গড়তে পারবেন না।
কথা হলো, শুরুতেই আপনি কে, কী বিশ্বাস করেন, সেটি নিয়ে পরিষ্কার একটি ঘোষণাপত্র তৈরি করা হবে। আমরা এই এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কাজ করছি, এটি পরিষ্কার থাকা দরকার। আমরা যখন মিটিংয়ে এসব কথাবার্তা বলি, তখনও এসব জুলাই ঘোষণাপত্র, জুলাই সনদ এসব বাজারে আসেনি। আপনি যদি কী উদ্দেশ্য সাধন করতে চান, কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান, সেটিতে একমত হন, তাহলে আমি জানব আপনি কী চান, আপনিও জানবেন আমি কেন লড়ছি।
সেখানে মিটিংয়ে একজন জানালেন যে আরেকটি দল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোতে গত দুই দশক প্রায় নীরবে বড় অবদান রেখেছেন এমন কয়েকজন অ্যাক্টিভিস্ট একই লক্ষ্যে কাজ করছেন। তাই পরের মিটিংয়ে তাঁদের একজনকে আমন্ত্রণ জানানো হলো তাঁদের বিষয়টি বোঝার জন্য। দেখলাম, কনসেপ্ট মোটামুটি ঠিকই আছে। আমি একই চাকা দুইবার আবিষ্কারের কোনো কারণ দেখলাম না, সুতরাং তাঁদের সাথেই সংহতি জানালাম।
সো, সংক্ষেপে এভাবেই বাংলাদেশ সনদের জন্ম। আমি লজ্জার সাথে বলতে চাই, এই সনদ প্রণয়নে আমার কোনোই ভূমিকা নেই। আমি কোনো আলোচনায়ই অংশ নিতে পারিনি। কিন্তু যারা এই কাজটি করেছেন, তাঁদের প্রত্যেককে আমি শতভাগ বিশ্বাস করি, তাঁদের মেধা, মনন, যোগ্যতা আমার চেয়ে শতগুণ।
আমাদের সীমিত সামর্থ্য, ডেইলির ফায়ারফাইটিং, সুতরাং কাজের অভাব নেই। আমরা সেই কাজগুলো করার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র চেষ্টা করেছি। সেই কাজ মহাসমুদ্রে হয়তো এক চামচ পানি, কিন্তু সেই পানিরও দরকার ছিল। আজকে যে তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’, রাষ্ট্রের সব অর্গান এক করেও ইউনূস সরকার ক্ষমতায় টিকতে পারল না, বিষয়টি এত সহজ না। সেখানে এসব চামচ চামচ পানির অবদান আছে। বহু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় খেলা চলেছে বহু লেভেলে; বহু লোকের ‘পাছা’ গেছে বহু টেবিলে।
এখন আসেন সনদের সমস্যাগুলো কী, সে প্রসঙ্গে। অনেকেই বলছেন, এতে বাহাত্তরের সংবিধানের বাইরে এসব কী কী নিয়ে এসেছে! আপাতদৃষ্টিতে দেখলে এই প্রশ্নের যৌক্তিকতা আছে, কিন্তু বাস্তবে নেই। বাহাত্তরের সংবিধান অনেক বড় বিষয়। এই সনদ জাস্ট একটি চাওয়া পাওয়া, কেমন বাংলাদেশ চাই, তার স্টেটমেন্ট। সেটা বাহাত্তরের সংবিধানেই চাই। এটি কারো কাউন্টারও না (যদিও নামে ‘সনদ’ হওয়ায়, এবং প্রকাশে দেরি হওয়ায় এটিকে জুলাই সনদের কাউন্টার কি না, সে প্রশ্ন যারা তুলেছেন, তারা যৌক্তিকভাবেই তুলেছেন। সে যাকগে)।
আপনি এটার সাথে পুরোপুরি একমত হতে পারেন, আংশিক একমত হতে পারেন, কোনো ব্যাপার না। আপনি মনে করতে পারেন, এর সাথে আরও কিছু বিষয় যুক্ত করার দরকার ছিল; মনে করতে পারেন, কিছু কিছু জিনিস বাদ পড়েছে। হ্যাঁ, সব কথাই ঠিক। কিন্তু আপনি যদি মনে করেন সনদে যেসব বিষয় চাওয়া হয়েছে, সেগুলোর বাংলাদেশ আপনি চান না, তাহলে আপনার সাথে আমার মৌলিক তফাৎ স্পষ্ট। এটি জরুরি। আমি এগুলো চাই। আপনার চাওয়া আরও বেশি হলে আমার সমস্যা নেই, কিন্তু কম হলে আপনার সাথে আমার ফান্ডামেন্টাল জায়গায় অমিল।
আমি এগুলো চাই, তাই আমি স্বাক্ষর করেছি। হ্যাঁ, এই সনদ আমার কাছে পূর্ণাঙ্গ মনে হয়নি, আমি আরও কিছু জিনিস চাই। কিন্তু সনদেরগুলো সহই চাই।
এই সনদ দিয়ে কী হবে? আপাতত হয়তো কিছুই হবে না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অনেক কিছু হবে, বলব অন্য এক লেখায়।
কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল করে দেখবেন, এই প্রথমবার আপনার আমার ফিড সনদময়। পক্ষে হোক বা বিপক্ষে, বাংলাদেশ সনদ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মানে, আপনি আমি ন্যারেটিভ নির্মাণ করেছি। অন্যের ন্যারেটিভে রিঅ্যাকশন দিচ্ছি না; নিজেরা একটি ন্যারেটিভ প্রস্তাব করে সেটিকে মূল আলোচনায় এনেছি।
আমার পয়েন্ট শুধু এটুকুই। আপনি যদি ন্যূনতম এতটুকু চান তাহলে সনদে স্বাক্ষর করুন। আপনার আরও চাওয়া থাকতে পারে, সেগুলোতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমি আপনি ন্যূনতম এতটুকু কি চাই? তাহলে আমরা এক দলিলের স্বাক্ষরকারী। অথবা আপনি স্বাক্ষর না করতে পারেন, আপনি কী চান সেগুলো লিখুন, নিজের জন্য লিখুন, অন্যের জন্য লিখুন। কেমন বাংলাদেশ চান সেটি নিয়ে আলাপ করুন। এই সনদের মালিকানা কেউ দাবি করছে না, সুতরাং অমুকের প্রণীত সনদে আপনি স্বাক্ষর করছেন না। আপনি শুধু আপনার মতোই আরেকজনের সাথে যুক্ত হচ্ছেন, যারা একই বিশ্বাসে বিশ্বাসী।
এই যে ‘কেমন বাংলাদেশ চাই’, ‘কেমন বাংলাদেশ হওয়া প্রয়োজন’, সেটি নিয়ে কথা বলা, এটিই গুরুত্বপূর্ণ। এই যে নিউজ ফিড সনদময়, এই যে দেখা যাচ্ছে হাজার হাজার বাঙালি একই রকম চাওয়া পাওয়া লালন করে, এটিই যূথবদ্ধতার শক্তি ও সাহস তৈরি করে।
পৃথিবীর বহু কিছুই খুব ছোট ছোট উদ্যোগের মিলনে শুরু হয়েছিল।
আমার একটি উদ্যোগ, আপনার একটি উদ্যোগ, আমরা দ্বিমত হতে পারি, কিন্তু লক্ষ্য যদি এক থাকে সেই দ্বিমতে সমস্যা নেই। অসংখ্য নালা ও নদী আলাদা বয়ে গেলেও, একদিন তারা মোহনায় মিলবেই।
আমি তাই বাংলাদেশ সনদকে এন্ডোর্স করে সমমনা সকলের সাথে সংহতি ঘোষণা করছি।
