নিজস্ব প্রতিনিধি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের পিটুনিতে নিহত হওয়ার অভিযোগ তুলে গেজেটভুক্ত হয়েছেন ‘জুলাই শহীদ’ উবাইদুল হক (গেজেট নম্বর ৬৪৩)। তার সঙ্গী মো. রিপন পেয়েছেন ‘জুলাই যোদ্ধা’র স্বীকৃতি। কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। কোনো রাজনৈতিক হামলা নয়, বরং ৫ আগস্ট দিবাগত মধ্যরাতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান কাভার্ড ভ্যানচালক ও বিএনপি কর্মী উবাইদুল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এই দুর্ঘটনাকে ৪ আগস্টের ‘হামলার গল্প’ বানিয়ে গেজেটভুক্ত করার নেপথ্যে রয়েছেন বহিষ্কৃত যুবদল নেতা কামাল খান।
মামলার এজাহারে দাবি করা হয়েছিল, ৪ আগস্ট বিকেল ৪টায় পল্টন এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের হামলায় উবাইদুল গুরুতর আহত হন। অথচ ‘চরচা’র হাতে আসা ৫ আগস্ট বিকেলের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, উবাইদুল তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়ি এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িতে হামলায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এমনকি ৫ আগস্ট বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটেও সহকর্মী মনিরের সাথে ফোনে কথা বলেন তিনি। অথচ মামলার দাবিতে ওই সময় তার ‘মরোমরো’ অবস্থায় থাকার কথা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মৃত্যু সনদে উবাইদুলের মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্পষ্ট উল্লেখ আছে— ‘H/O RTA’ (History of Road Traffic Accident)। হাসপাতালের রেকর্ড অনুযায়ী, ৬ আগস্ট রাত ২টায় তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় ভর্তি করা হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণে তাকে তাৎক্ষণিক লাইফ সাপোর্টে নিতে হয়েছিল। চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের ইনজুরি নিয়ে কারো পক্ষে একদিন বাসায় থাকা বা ৫ আগস্ট এলাকায় ঘুরে বেড়ানো চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অসম্ভব।
উবাইদুলের সঙ্গী ও সরকারি ভাতাভোগী ‘জুলাই যোদ্ধা’ মো. রিপন ঘটনার দিন ৪ আগস্ট বলে দাবি করলেও তথ্যের ব্যাপক গড়মিল পাওয়া গেছে। ৫ আগস্টের ভিডিও ফুটেজের কথা তুললে তিনি দাবি করেন, সেটি উবাইদুল নয়, উবাইদুলের বেশে ‘জিন’ ছিল।
তবে মোটরসাইকেলের মালিক মাসুদ রানা জানান ভিন্ন কথা। ৫ আগস্ট রাতে তার পালসার মোটরসাইকেলটি নিয়ে রিপন ও উবাইদুল বের হন এবং কাকরাইল এলাকায় আইল্যান্ডের সাথে সজোরে ধাক্কা খেয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটে। এতে মোটরসাইকেলের সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
এই সাজানো মামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা যুবদলের বহিষ্কৃত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামাল খান। তিনি মামলার বাদী উবাইদুলের ভাই এমদাদুল হককে দিয়ে মিথ্যা এজাহার লেখান বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও শুরুতে অস্বীকার করেন, তবে তথ্য-প্রমাণের মুখে কামাল খান স্বীকার করেন যে, আওয়ামী লীগ নেতা সুলতানকে ধাওয়া করতে গিয়েই মোটরসাইকেলটি দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল।
এই জালিয়াতির বিষয়ে পিবিআই (পিবিআই) জানিয়েছে, তাদের তদন্তে এটি নিশ্চিতভাবে একটি সড়ক দুর্ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. মতিউর রহমান একে ‘পুরোমাত্রায় প্রতারণা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। নবনিযুক্ত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান জানিয়েছেন, প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও নাশকতায় জড়িত থাকার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও উবাইদুলের পরিবারকে ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ১৩ লাখ টাকা সহায়তা প্রদান করা হয়েছে, যা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
