আব্দুন নুর তুষার
নওফেল আমার ছোটভাইসম। তিনি মন্ত্রী হয়ে যা জেনেছেন সেটাই যে সঠিক ছিলো – এই ভাবনাটা সঠিক না। তিনি বিদেশে পড়েছেন – পড়েছেন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের সম্পর্কে ও দেশের পাঠাগার বই এবং বই পড়ার অভ্যাস সম্পর্কে তার ধারণা আওয়ামীলীগ এর মন্ত্রীদের চারপাশে ঘুরন্ত চাটুকারদের দিয়ে প্রভাবিত।
কেন্দ্রের পাঠতালিকায় শুধু বঙ্গবন্ধু বা মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বই নেই এই কথাটা সত্য না। তবে প্রতি ক্লাসে এই বই পড়ানোর কোনো কারণ ছিলো না। তারা চাপ দিতেন সব ক্লাসে এটা রাখতে। সেভেনে পড়লে এইটেও পড়বে একই বিষয়? আর আবদার ছিলো এসব বই লিখবে ও প্রকাশ করবে তাদের পেয়ারা ভাড়াটিয়া লেখক প্রকাশক শ্রেনী।
রিডিং হ্যাবিট প্রকল্পের অ্যাসেসমেন্ট কারা করেছিলো? পাঠাভ্যাস উন্নয়ন হলো কিনা এটা দেখতে হবে দুভাবে। একটি হলো প্রকল্প চালু হবার আগে সৃজনশীল বই পড়তো কতজন ও প্রকল্প শেষ হবার পর কতজন। আরেকটি হলো এই পাঠাভ্যাস করা ছেলেমেয়েরা কি আরো বই কিনছে? আরো বেশি বই পড়ে কি তারা নিজেরা কিছু লিখছে? চলচ্চিত্র গান কবিতা গবেষণায় কি এরা বেশি আসছে নাকি যারা বই পড়ে না তারা আসছে? ঢাকায় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ভবন পুরোপুরি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কার্যালয় নয়। এখানে একাধিক মিলনায়তন ও আলোচনা কক্ষ আছে যা ভাড়া দিয়ে কেন্দ্র তার আয়কে বই পড়ানো সহ নানারকম সেবাখাতে খরচ করে। পনেরোটি এসির মোট বারোটি এসব ভাড়া দেয়া কক্ষে আছে। এখানে কনসাল্টেন্সি বাবদ খরচ করার কথাটিও সর্বৈব সঠিক নয়। প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী পর্যায়ে তেমন কোনো ইম্প্যাক্ট হয় না । এই কথাটাও ভুল। এই ইম্প্যাক্ট কিভাবে দেখা হয়েছে সেটাই সাবেক এই মন্ত্রী বলতে পারবেন না।
কেন্দ্র ঢাকা ভিত্তিক কিছু কার্যক্রম করে যা অতি সামান্য। সেটির কারণে রাজধানীর এলিটদের মনে প্রশান্তি আসা কোনো অপরাধ নয়। তবে বাস্তবতা আসলেই ভিন্ন। এই প্রশান্তি আনার উৎকট চেষ্টা বরং ছিলো কনসার্ট ভিত্তিক সিআরই উদ্ভাবিত নানাবিধ প্রকল্প সহ জয় বাংলা কনসার্টে। যেখানে গায়ক সাত মার্চে চিৎকার করে সকলকে ওয়েলকাম টু দ্য ফ — কিং কনসার্ট বলে লাফ দিতো। আর ছিলো কোভিডের সময় হাতির ঝিলে আতশবাজি ফুটানোয়। আরো ছিলো পদ্মা সেতুর দুপাশে মাসব্যাপি জলসায়। এগুলো হলো অপচয়। এগুলো কোন শুভংকর করতো?
নওফেল বলেছেন” আমাদের প্রস্তাব ছিল—বছরে প্রায় ৪০-৫০ কোটি টাকা (কমবেশি প্রতি বছর) যেটি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র নিয়ে যায় – বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র এই টাকা নিয়ে যায় না বরং এই টাকা দিয়ে মানুষকে বই পড়ায়। টাকা নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু ভাবতে না পারার কারণ হলো আওয়ামী লুটিয়েন্সরা টাকা নিয়ে যেতো।
আরো বলেছেন “যদি জেলা পর্যায়ের পাঠাগারগুলোর মধ্যে এই অর্থ বণ্টন করা হয়, তাহলে সারা দেশে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার বাস্তব পরিবর্তন দেখা যেত। “
এই পাঠাগারগুলো কি টাকা নেই বলে বই পড়াতে পারে না? জেলার পাঠাগারগুলোকে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে কি কেউ না করেছে? তারা সেটা পারে না বলেই সরকার বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রকে বেছে নিয়েছিলো। কারণ কেন্দ্র বই নিয়ে পাঠকের কাছে যায় আর পাঠাগারগুলো সচিব মন্ত্রী নানা কোটায় কেনা বাপ মা শালা শালীদের লেখা বই দিয়ে পরিপূর্ণ থাকে। তারা আলমারীতে বই তালা মেরে গদিতে বসে থাকে। যা এই কিছুদিন আগে ফারুকি কর্তৃক পদচ্যুত আফসানা আপা সবিস্তারে বলেছেন।
এই কাজ জেলা পাঠাগার অনেক সহজেই পারে? রিচ বেশি, খরচ কম, ইম্পেক্ট অনেক বেশি। এতো সহজ কাজ ? এটা পারলে পঞ্চাশ বছরে করে নাই কেন? আর এটা কি করে নওফেল বুঝলেন। নিজেদের নিয়মিত কাজটাই তো ঠিকমতো এরা করে না। ইমপ্যাক্ট বেশি এটা কোন এনালিস্ট বললো? খরচ কম হলো কিভাবে? খরচ তো পঞ্চাশ কোটি এখানেও যেমন সেখানেও তেমন। তিনি নিজেই তো বললেন এই টাকা তিনি পাঠাগারকে দিতে চেয়েছিলেন। দিলে খরচ একই থাকতো – হালকা লুটপাট হতো এই আরকি।
সাবেক মন্ত্রী আরো বলেছেন ‘বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মূল কার্যালয় ঢাকায়। প্রচুর টাকা নিয়ে নেয়। কয়েকটি জেলা শহরে কেন্দ্রিক কার্যক্রম, বিশাল এনজিও কাঠামো, আর কিছু বাসে বই নিয়ে ‘শো-ডাউন’। তাই সর্বোচ্চ ইমপ্যাক্ট এর জন্যে এদের মনোপলি ব্যবসা ভাঙার দরকার ছিলো, প্রকল্পকে বিকেন্দ্রীকরণ করা দরকার ছিলো।”
এই লাইনগুলো পরিস্কার এক মিথ্যা। কেন্দ্র টাকা নিয়ে ঢাকায় খরচ করে না। ব্যবসাও করে না। এটা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঢাকায় এই কথাটাও উদ্ভট এক অভিযোগ। দেশের প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় অফিস ঢাকায়। নওফেল তো চট্টগ্রামের এমপি। উনি ঢাকায় অফিস করতেন – ঢাকায় থাকতেন। তিনি বিদেশী নাগরিক বলেও অভিযোগ আছে। উনি কেন চট্টগ্রামে থাকতেন না? কেন্দ্র বই নিয়ে শো ডাউন করে এই কথাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। নওফেলের প্রয়াত পিতা বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচির চট্টগ্রামের পুরস্কার অনুষ্ঠানের যাবতীয় ডেকোরেশন ব্যয় যেমন প্যান্ডেল বাতি মঞ্চ ও স্থান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন থেকে দেবার নিয়ম পাকাপোক্ত করে দিয়ে গেছেন। কেন্দ্র কি চট্টগ্রামে শো ডাউন করতো যে তার বাবার মতো অভিজ্ঞ মানুষ সেটা বোঝে নাই? আর স্কুলে স্কুলে বই পড়ানো কি মনোপলি ব্যবসা? তাহলে নওফেল এর পিতা চট্টগ্রাম শহরের ৬৭ টা স্কুলে বই পড়ার কর্মসূচিকে বাধ্যতামূলক করেছিলেন কেন?
নওফেল বলেছেন “সাহিত্য কেন্দ্র এই প্রকল্পের বাইরেও অনেক টাকা পেতো, প্রচুর টাকা। কিন্তু যথাযথ ব্যবহার হতোনা। ” এই কথা সম্পুর্ণ ভিত্তিহীন। এই কথা বিদেশে কোনো মন্ত্রী বললে তাকে ক্ষমা চাইতে হতো। কেন্দ্র প্রকল্পের বাইরে কোনো টাকা পায় না। সরকারি টাকা গনিমতের মাল মনে করার অভ্যাস থেকে এই কথাটা বলা হয়েছে। কেন্দ্রের প্রতিটি আয় ব্যয় প্রসিদ্ধ অডিটর ফার্ম নিরীক্ষণ করে ও সরকারের টাকার হিসাব সরকারের কাছে দেয়া হয়। যথাযথ ব্যবহার করা হতো না এটা কোথা থেকে তিনি জানলেন?
সাবেক এই দুশ দিনের মন্ত্রী বলেছেন ‘সাবেক কিছু প্রভাবশালী আমলা আর তথাকথিত সুশীল সমাজের একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করা হয়েছিল—যারা তদবির করে এই প্রবাহ অব্যাহত রেখেছে।”এটাও অতিকথন। বরং আওয়ামীলীগ এর আমলা ও চাটুকার সুশীল বলয় নির্ভর রাজনীতির ইমপ্যাক্ট এর ফলে এখন নওফেল ও তার সহকর্মীরা পলাতক উদ্বাস্তু জীবনে দিন কাটাচ্ছেন।
এবার তিনি বলেছেন “প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছে সহজে পৌছানোর জন্যে প্রথম আলো ডেইলি স্টার মডেলের লোক দেখানো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট দিয়ে রিডিং হ্যাবিট হয়না। আর এই সুপারিশ এসেছিলো ইম্প্যাক্ট এসেসমেন্ট যারা করেছেন তাদের কাছ থেকে। “
প্রথম আলো ডেলি স্টারের জন্মের বহু আগে থেকে কেন্দ্র বই পড়ায়। কারা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর কাজ লোক দেখানো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টকে দিয়ে করিয়েছিলো আর টাকা লোপাট করেছিলো সেটা সবাই জানে। সবকিছুকে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ভাবার স্বভাবটাও ব্যাংক লুটেরা শ্রেনীর সাথে অধিক মেলামেশা জনিত ডেলুলু অবস্থার পরিচায়ক। সবখানে প্রথম আলো ডেলি স্টারের ভুত দেখার সাথে মিল পাই ইউনুসিয়াল মবের সাথে। এই বিষয়ে তাদের গলায় গলায় মিল।
উনি বলেছেন “জনাব আব্দুল্লাহ আবু সাইদ সাহেব বয়স্ক মানুষ। আমি উনার ব্যাপারে মন্তব্য করবোনা। তার আদর্শিক অবস্থান নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধ কালীন ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আছে। সেগুলোতে না গেলাম। তবে বিতর্ক গুলো ভিত্তিহীন নয়। সমালোচনা আলোচনা মানুষ করবেই। “আপনি তো বাক স্বাধীনতার লোক। আপনার এই আলোচনায় রুষ্ট হওয়ার কথা না। “
সমস্যা হলো নওফেলের দল বাকস্বাধীনতার লোক না। উপরের বাক্যটা এজন্যই তিনি বলেছেন। নইলে তিনি নিজেকে বাকস্বাধীনতার লোক বলতেন। সত্য কথায় তার দল রুষ্ট হয়। তার দল এর চামচারা কার্টুন আঁকলে কারাগারে জামিন না দিয়ে মোশতাকের জান কবচ করেন আর কিশোরের কানের পর্দা ফাটান।
তিনি লিখেছেন “আলোকিত মানুষ গড়ার মিষ্টি কথা, আর বড় বড় বক্তব্য—এসবের আড়ালে যদি কোটি কোটি টাকার হিসাব অস্বচ্ছ থাকে, তেমন কোনো ফল না আসে, তাহলে সেটার জবাব কে দেবে?”
এই কথাগুলো অসত্য। বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে বড় বড় কথা আর পিকে হালদার এস আলম এর মত লুটেরা চোর প্রতিপালনকারী দলের মন্ত্রীর মুখে হিসাবের স্বচ্ছতা সংক্রান্ত বুলি শুনলে – বলতে হয় – নাটক কম করো – পিও। ব্যাংক হরিলুটের জবাব কে দেবে? নাকি এসব স্বচ্ছতা।
এরপর নওফেল কল্পনা করেছেন। ‘আর এই সরকারও সম্ভবতঃ এই শুভংকরের ফাকি ধরে ফেলেছিলো, তাই নিজেই উপস্থিত হয়েছেন “স্যার”। “
অভদ্রদের পোষনকারী আওয়ামীলীগ এটা বুঝবে না যে স্যার মধ্যাহ্নের আহারের আমন্ত্রনে গিয়েছিলেন। এটা তারেক রহমানের ভদ্রতা। এই ভদ্রতা দুয়েকজন বাদে আওয়ামী লীগের কারো মধ্যে ছিলো না। তাদের নেত্রী এস আলমকে ডিনারে ডাকতে ভালোবাসতেন! সেটা নিয়ে তারা চুপ থাকতেন।
ভাই নওফেল বলেছেন – “আমি মন্ত্রী ছিলাম ২০০ দিন, এই শুভংকরের ফাঁকিটা আটকাতে পারিনি। এটা আমার ব্যর্থতা।”
প্রিয় ভাই – আপনি এখনো আপনার ব্যর্থতা বোঝেন নাই। আপনি যে দলবল সহ নির্বাসনে – এটার কারণগুলো খোঁজেন। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়লে এটা অন্তত বুঝতেন আপনার ব্যর্থতা কোথায়। আপনার ব্যর্থতা আপনার মনে। আপনার বাবা পারতেন স্বৈরাচারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে। আপনি পারেন নাই। আপনার ব্যর্থতা দলটাকে গুপ্তদের আশ্রয় বানিয়ে গুপ্তযুগ ও চৌর্যযুগের উদাহরণে পরিনত করায়।
আর আপনি সৎ হলেও – আপনি আর আপনার অসৎ ক্ষমতালোভী সঙ্গীরা যে লক্ষ কোটি সমর্থকদের এতিম করে নিরাপদ আশ্রয়ে আছেন – এটাও আপনার ব্যর্থতা।
আপনারা আলোকিত মানুষ চাইবেন কেন? আপনারা চাইবেন তৈলধারি রিজেন্ট শাহেদ – চাইবেন দুই এন আইডি বিশিষ্ট সাবরিনা। চাইবেন আলম – সালমান – ইকবাল – মজুমদার- রন শিকদার- জাবেদ এর মতো লুটেরাদের। তাই না? আপনারা চাইবেন হলমার্ক ইভ্যালি ই অরেঞ্জ। চাইবেন পিকে হালদার আর যতো মালদারদের।
আপনাদের যতো আলো সব আলোআসবেই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। তাই না?
কি বলেন ?!
