কাউকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ প্রথম দেখায় হঠকারী বা হাস্যকর মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস। বিভিন্ন দেশে এটি কেবল ক্ষোভ প্রকাশের উপায় নয়, বরং প্রতীকী অপমান ও প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন গ্রিস ও রোমে জনসমক্ষে অপমান ছিল সামাজিক শাস্তির একটি রূপ। অপছন্দের শাসক বা দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে হেয় করতে পচা ফল, সবজি বা ডিম ছোড়া হতো। উদ্দেশ্য ছিল না শারীরিক ক্ষতি করা, বরং সামাজিক মর্যাদাহানি ঘটানো।
এশিয়া মাইনরের প্রাচীন কবি হিপোনাক্সের লেখায়ও সমাজচ্যুত ব্যক্তিদের দিকে পচা খাবার ছোড়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। মধ্যযুগীয় ইউরোপে ‘চারিভারি’ নামে পরিচিত গণ-উপহাসের রীতিতেও অপমান প্রদর্শনের অংশ হিসেবে পচা ডিম বা ময়লা ছোড়া হতো। একইভাবে, ‘পিলরি’ শাস্তির সময় জনতা অপরাধীদের দিকে পচা খাবার নিক্ষেপ করত।
এলিজাবেথান যুগে মঞ্চনাটক অপছন্দ হলে দর্শকেরা অভিনেতাদের দিকে ডিম ছুড়ত। উনিশ শতকে রাজনৈতিক সমাবেশেও ডিম ছোড়ার নজির পাওয়া যায়, যা ধীরে ধীরে সংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়।
আধুনিক যুগে ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রাজনীতিবিদদের লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বার্তা ছিল স্পষ্ট—ক্ষমতার প্রতি অসম্মতি ও প্রতীকী প্রত্যাখ্যান। সমাজবিজ্ঞানীরা এই আচরণকে “প্রতীকী সহিংসতা” বলে আখ্যা দেন, যেখানে আঘাতের চেয়ে অপমানই মূল উদ্দেশ্য।
ডিম বেছে নেওয়ার পেছনে ব্যবহারিক কারণও রয়েছে। এটি সহজলভ্য, তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর, কিন্তু গায়ে লাগলে অপমানজনক পরিস্থিতি তৈরি করে। দুর্গন্ধ ও আঠালো ভাব ঘটনাটিকে দৃশ্যত নাটকীয় করে তোলে, যা গণমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এই প্রতীকী প্রতিবাদের আইনি দিকটি ভিন্ন। বাংলাদেশে কারও দিকে ডিম ছোড়া কেবল সামাজিক অপমান নয়, আইনের চোখে তা অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৩৫২ অনুযায়ী, গুরুতর উসকানি ছাড়া কারও ওপর বলপ্রয়োগ বা আক্রমণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ডিম নিক্ষেপকে ‘অ্যাসল্ট’ বা ‘ক্রিমিনাল ফোর্স’ হিসেবে ধরা হলে সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ড বা জরিমানা হতে পারে।
ডিম নিক্ষেপে শারীরিক আঘাত লাগলে ধারা ৩২৩ অনুযায়ী এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধান রয়েছে। উসকানির প্রেক্ষাপটে সংঘটিত হলে ধারা ৩৩৪ প্রযোজ্য হতে পারে, যেখানে শাস্তি তুলনামূলক কম।
প্রকাশ্যে অপমান বা শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা থাকলে ধারা ৫০৪ প্রযোজ্য হতে পারে, যার শাস্তি সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড। জনসমক্ষে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে ধারা ২৯০ অনুযায়ী ‘পাবলিক নুইসেন্স’-এর অভিযোগ আনা যেতে পারে। এমনকি কারও সম্মানহানি হলে ধারা ৪৯৯ ও ৫০০ অনুযায়ী মানহানির মামলাও হতে পারে।
আইনজীবীরা বলছেন, ডিম ছোড়া আপাতদৃষ্টিতে ছোট ঘটনা মনে হলেও পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য ও ফলাফলের ওপর নির্ভর করে একাধিক ফৌজদারি অভিযোগ গঠন হতে পারে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে ডিম ছোড়া প্রতিবাদের এক প্রতীকী ভাষা হলেও বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে – এ বাস্তবতা মনে রাখা জরুরি।
