নিজস্ব প্রতিনিধি
রাজধানীর পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯) নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ঢাকা-৭ আসনের বিএনপি ঘরানার সাবেক প্রভাবশালী নেতা ইসহাক সরকার। চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই প্রাণ দিতে হয়েছে সাধারণ এই ব্যবসায়ীকে। তবে এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ইসহাক সরকারের রাজনৈতিক ভোলবদল নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও মামলার এজাহার অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর মিটফোর্ড এলাকায় চাঁদাবাজির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেন ইসহাক সরকার। এতদিন সোহাগের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসিক ৬ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হতো। সম্প্রতি ইসহাক এই চাঁদার পরিমাণ দ্বিগুণ করে ১২ লাখ টাকা নির্ধারণ করেন এবং সোহাগকে সরিয়ে যুবদল নেতা মাহমুদুল হাসান মহিনকে দায়িত্ব দেন।
প্রাণভয়ে সোহাগ স্থানীয় অন্য এক বিএনপি নেতার গ্রুপে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করলে ক্ষুব্ধ হন ইসহাক। অভিযোগ রয়েছে, ইসহাক সরকারের সরাসরি নির্দেশে ও পরিকল্পনায় মহিন গ্রুপ গত বুধবার সন্ধ্যায় মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে সোহাগকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে হত্যা করে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও ঘাতকরা লাশের ওপর দাঁড়িয়ে উল্লাস করে এবং পাথর দিয়ে আঘাত করতে থাকে।
সোহাগ হত্যাকাণ্ডে নাম আসায় এবং দল থেকে চাপের মুখে পড়ার পর কৌশল পরিবর্তন করেছেন ইসহাক সরকার। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশে (আইডিইবি) এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগদান করেন।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের উপস্থিতিতে তিনি দলটিতে যোগ দেন। অনুষ্ঠানে তাকে ‘অনুপ্রেরণা’ ও ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করেন নাহিদ ইসলাম। ইসহাক সরকারের সাথে তার বিপুল সংখ্যক অনুসারীও এদিন এনসিপিতে ভিড়েন। এ সময় এনসিপির শীর্ষ নেতা সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন। একই অনুষ্ঠানে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি ফেরসামিন হক ইকবাল এবং আলোচিত আন্দোলনকারী মহিউদ্দিন রনিও এনসিপিতে যোগ দেন।
এদিকে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনগুলো কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, অপরাধীর কোনো ছাড় নেই। এরই মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে যুবদল নেতা রজ্জব আলী পিন্টু এবং সাবাহ করিম লাকিকে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপি হাইকমান্ড আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
ডিএমপি ও র্যাব জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে মাহমুদুল হাসান মহিনকে ৫ দিন এবং তারেক রহমান রবিনকে ২ দিনের রিমান্ডে নিয়েছেন আদালত। রবিনের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তলও উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহত সোহাগের বোন মঞ্জুয়ারা বেগমের দায়ের করা মামলায় ১৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ব্যবসায়ী মহলে এখন একটাই প্রশ্ন—রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করে কি পার পেয়ে যাবেন এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারিগররা?
