যুক্তরাষ্ট্রে হেলথ ইন্স্যুরেন্স থাকা মানেই নিশ্চিন্ত চিকিৎসা এই ধারণা দিন দিন ভেঙে পড়ছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান সময়ে মেডিকেইডসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যবীমা পরিকল্পনায় সুবিধা কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত অভিবাসীরা।
যেসব ওষুধ আগে স্বাস্থ্যবীমায় কাভার হতো, এখন সেগুলোর বড় অংশই আর মিলছে না। অনেক ক্ষেত্রেই দিতে হচ্ছে কো-পেমেন্ট, আবার বহু ওষুধ কিনতে হচ্ছে পুরোপুরি নিজের পকেট থেকে। ফলে স্বাস্থ্যবীমা থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যয় মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশি মালিকানাধীন কয়েকটি ফার্মেসির মালিকরা জানান, এখন সাধারণ কাশির সিরাপ, ভিটামিন কিংবা চোখের ড্রপও অনেক সময় ইন্স্যুরেন্সে কাভার হয় না। ডায়াবেটিসসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগের ওষুধেও আগের তুলনায় বেশি কো-পেমেন্ট দিতে হচ্ছে।
ব্রঙ্কসের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ জানান, পরিবারের চারজন ফ্লুতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের দেওয়া সিরাপ ইন্স্যুরেন্সে অনুমোদন না পাওয়ায় তাকে ৮০ ডলার খরচ করে কিনতে হয়েছে। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান কুইন্সের বাসিন্দা আজারুল শেখ। চোখের চিকিৎসার জন্য দেওয়া ড্রপ, যা এক বছর আগেও কাভার ছিল, এখন তাকে ওভার দ্য কাউন্টার কিনতে হয়েছে।
স্বাস্থ্যনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, সমস্যার বড় কারণ হলো কো-পেমেন্ট ও ডিডাকটিবল বৃদ্ধির পাশাপাশি অ্যাফরডেবল কেয়ার অ্যাক্টের আওতায় দেওয়া অতিরিক্ত প্রিমিয়াম ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হওয়া। ২০২৬ সাল থেকে এই ভর্তুকি কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে সেলফ এমপ্লয়েড, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার ও কন্ট্রাক্টরদের মাসিক প্রিমিয়াম আরও বাড়বে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে প্রেসক্রিপশন ওষুধের ক্ষেত্রে। অনেক রোগী কো-পেমেন্ট বহন করতে না পেরে ওষুধ কেনা পিছিয়ে দিচ্ছেন, ডোজ কমাচ্ছেন বা পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছেন। চিকিৎসকদের মতে, এটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া কো-পে অ্যাকুমুলেটর ও ম্যাক্সিমাইজার প্রোগ্রামের কারণে ওষুধ প্রস্তুতকারকের দেওয়া সহায়তা ডিডাকটিবলে গণনা না হওয়ায় বাস্তবে পুরো ব্যয় রোগীকেই বহন করতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবীমা কাঠামোতে মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। তারা মেডিকেইডের যোগ্য নন, আবার উচ্চ আয়ের মতো ব্যয় বহনের সামর্থ্যও নেই। ফলে তারা পড়ছেন এক ধরনের ‘সহায়তাহীন ফাঁদে’।
বাংলাদেশি প্রবাসী কমিউনিটিতেও এই সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, মিশিগান ও টেক্সাসে বসবাসরত বহু পরিবার চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে সঞ্চয় ভাঙছেন, ঋণ নিচ্ছেন বা জরুরি চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছেন।
স্বাস্থ্যনীতি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ভর্তুকি নবায়ন না হলে প্রায় ২০ মিলিয়ন মানুষ স্বাস্থ্যবীমা হারাতে পারে এবং অতিরিক্ত প্রায় ৪ মিলিয়ন মানুষ পুরোপুরি বীমাবিহীন হয়ে পড়তে পারে। তাদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি বড় অশনি সংকেত।
