দেশের অর্থনীতি সংকটে থাকলেও ব্যাংকে আমানতকারী কোটিপতির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশে বিপুল পরিমাণ টাকার উপস্থিতি নিয়ে সন্দেহের সুর উঠেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ স্থবির হওয়া, দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধির মতো নেতিবাচক চিত্রের মাঝেই এই অমিল ভাবনাকে অর্থবহ প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটিপতি আমানতকারী রয়েছে। এর আগের অর্থবছর ২০২৪ সালের শেষে ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ৮১টি। অর্থাৎ কঠিন পরিস্থিতিতেও কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা আরও বেড়েছে। এই খাতে ৫৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি নতুন অর্থ জমা হয়েছে।
অপরদিকে দেশের সাধারণ জনগণের অবস্থার চিত্র বিবর্তিত হতে দেখা যাচ্ছে। দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৭.৯৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। ব্যবসা স্থবির, বেকারত্ব বাড়ছে, ক্রয়ক্ষমতা কমছে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ অনিশ্চিত—এসব কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের জীবনে চাপ আরও বেড়েছে।
অর্থনীতির এই যাচ্ছি-না-যাচ্ছি অবস্থার মাঝেই রেমিট্যান্সের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ৩২.৮২ বিলিয়ন ডলার বা ৩,২৮২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন—এটি একক বছরে সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর আগের অর্থবছর ২০২৪ সালে রেমিট্যান্স ছিল ২,৬৮৯ কোটি ডলার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহের টোকেনারিও বাড়ছে; আবার একই সময়ে অদৃশ্য অর্থের প্রবাহ ও পাচারের ঘটনায় সরকারের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এফআইইউ (Financial Intelligence Unit) বা আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের কাছে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের তথ্য জানতে ১৭৪টি দেশে তথ্যপ্রমাণ চাওয়া হয়েছে—এ একবারের জন্য এমন ব্যাপক সহযোগিতা চাওয়া প্রথম। প্রায় ১,৩০০টি মানি লন্ডারিং ঘটনাও তদন্তের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পাঠানো হয়েছে। এই বছর ৪৪৮টি মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ বিএফআইইউতে জমা পড়েছে।
আধिकारिक একটি শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে; গড়ে প্রতিবছর ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচারের হিসাব দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া দুবাইতে বাংলাদেশিদের ৫৩২টি সম্পত্তি আছে, যার মূল্য ৩৭.৫ কোটি ডলার।
অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব দেশের ভেতরও স্পষ্ট। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মধ্যে ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি সঞ্চয় হ্রাস পাচ্ছে; অনেক ব্যবসায়ী কার্যক্রম ধরে রাখতেও চাপের মধ্যে। কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি সংকট ও সুদের উচ্চহার বিনিয়োগের পরিবেশকে জটিল করে তুলেছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলেন, “অবৈধ অর্থ প্রবাহ, রেমিট্যান্সের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং মধ্যবিত্তের আর্থিক চাপ একসাথে অর্থনীতির গঠনতন্ত্রকে অচেনা পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে।”
