শুরুতেই আমাদের জানা উচিত ক্যাঙ্গারু কোর্ট কি? “ক্যাঙ্গারু কোর্ট”—আইনের ভাষায় এটি কোনো বৈধ বিচারব্যবস্থা নয়; বরং ন্যায়বিচারের ছদ্মবেশে পরিচালিত এক অবৈধ, তড়িঘড়ি, পক্ষপাতদুষ্ট ও প্রহসনমূলক বিচার। শব্দটি এসেছে ইংরেজি প্রবাদ থেকে, যেখানে বোঝানো হয় বিচার এমনভাবে “লাফিয়ে লাফিয়ে” এগোয় যে সত্য ও প্রমাণের স্থির ভূমিতে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগই থাকে না। বিচারক, আসামি বা প্রক্রিয়া—সবকিছুই পূর্বনির্ধারিত। ফলাফলও সাধারণত একই—অন্যায়ের বিজয়, বিচারের পরাজয়। এবার আসুন মিলিয়ে নেই আইসিটি এবং ক্যাঙ্গারু কোর্টের মধ্যে মিল কোথায়।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) প্রতিষ্ঠার পর থেকেই একদল সমালোচক এটিকে “ক্যাঙ্গারু কোর্ট”—অর্থাৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, পূর্বনির্ধারিত রায়দাতা আদালত—হিসেবে দেখিয়ে আসছেন। দীর্ঘ বছর পেরিয়ে গেলেও ওই সমালোচনার সুর থামেনি; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও প্রখর হয়েছে। কেন এই অভিযোগ—আজকের সম্পাদকীয়তে আমরা সেই যুক্তিগুলোই পর্যালোচনা করবো।রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতাসীন দলের প্রাধান্যের অভিযোগ: সমালোচকদের মূল যুক্তি—ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। তাদের দাবি, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এমন সময়ে, যখন ক্ষমতাসীন দল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার জন্য দেশে কৃত্রিম অস্থিতিশিলতাকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
এই কারণে অভিযুক্তদের অধিকাংশই বিরোধী দলের রাজনীতিক হওয়ায় নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তোলা হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও আইনজীবী সংগঠন বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।
তাদের মন্তব্য ছিল—ট্রাইব্যুনালে
- মানসম্পন্ন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড
- অভিযুক্তের পর্যাপ্ত আইনি সুযোগ
- স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষক উপস্থিতি —এসবের ঘাটতি ছিল। সমালোচকেরা যুক্তি দেন, এসব মন্তব্য ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ অভিযোগকে আরও শক্তিশালী করে।
সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা ও চাপের অভিযোগ: কিছু মামলায় সাক্ষ্য বদলানো, সাক্ষীর তালিকা পরিবর্তন, এমনকি সাক্ষীদের ওপর চাপের অভিযোগ উঠে আসে। একটা আদালতে যদি সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তবে রায় যতোই কঠোর বা ন্যায়সংগত হোক, সন্দেহ থেকেই যায়। সাক্ষ্য প্রক্রিয়ার অনিয়ম ট্রাইব্যুনালের বিশ্বাসযোগ্যতায় বড় আঘাত করেছে।
প্রতিরক্ষা আইনজীবীদের সীমিত সুযোগ: কিছু প্রসিদ্ধ মামলায় প্রতিরক্ষা আইনজীবীরা অভিযোগ করেছিলেন যে তারা
- পর্যাপ্ত সময় পাননি,
- প্রয়োজনীয় নথির অ্যাকসেস সীমিত ছিল,
- আদালত অনেক আবেদন যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি।
প্রতিরক্ষার স্বাধীনতা সীমিত হলে আদালত স্বভাবতই পক্ষপাতমূলক হয়ে ওঠে—এটাই ক্যাঙ্গারু কোর্টের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
কিছু দ্রুতগতির রায় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে: মামলার রায় দেওয়ার গতি সম্পর্কে সমালোচকরা বলেন—এটি বিচার নয়, বরং বিচারকে “দেখানোর” প্রক্রিয়া ছিল।
তাদের ধারণা, বিচার দীর্ঘ হলে রাজনৈতিক প্রভাব কমে যায়, তাই দ্রুত রায় দেওয়াকে তারা “পূর্বনির্ধারিত বিচার কার্যক্রম” বলে দাবি করেন।
এই ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। সমর্থকেরা এটিকে ন্যায়বিচারের পুনরুদ্ধার বলে মনে করেন, আর সমালোচকেরা একই প্রক্রিয়াকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বলে অভিহিত করেন। এই ট্রাইব্যুনালের ঐতিহ্য রয়েছে। এখানেই গোলাম আজম, মীর কাশেম এবং দেলোয়ার হোসেনের মত কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। সেই ট্রাইব্যুনালকে কলঙ্কিত করার জন্যই এই ক্যাঙ্গারু কোরিটের নাটক।
বিচারের নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে যে বিতর্ক ভারতবর্ষ থেকে ইউরোপ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোচিত হয়েছে—এটি পরিষ্কার, যে প্রশ্নগুলো উঠেছিল, সেগুলোর উত্তর এখনো অনেকের মতে সন্তোষজনকভাবে মেলেনি।