দেশের একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ঘেরাও, কার্যালয়ে আটকে রাখা এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা বাড়তে থাকায় উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, আগের শাসনামলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে কিছু ছাত্রনেতা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সরাসরি ‘অভিযান’ চালাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না বলেও সমালোচনা রয়েছে।
সাম্প্রতিক আলোচিত ঘটনা ঘটে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এ। আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমান ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ছাত্রনেতাদের একটি দল তাকে জোর করে প্রক্টরের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট ছাত্রনেতারা দাবি করেন, গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে ‘কর্তৃপক্ষের কাছে সোপর্দ’ করা হয়েছে। তবে অধ্যাপক রোমান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত হলেও কাউকে ভয়ভীতি দেখানো বা আক্রমণ করার অধিকার কারও নেই। আইনজীবী সারা হোসেন মনে করিয়ে দেন, ফৌজদারি কার্যবিধিতে নাগরিক গ্রেপ্তারের সুযোগ থাকলেও সেখানে হামলা বা অপমানের কোনো বৈধতা নেই।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েই এর আগে উপাচার্য ও একাধিক শিক্ষককে ঘেরাও বা কার্যালয়ে আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। একই ধরনের পরিস্থিতির কথা শোনা যাচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এও। কোথাও ডিনদের পদত্যাগে চাপ, কোথাও শিক্ষককে ক্লাস নিতে বাধা, আবার কোথাও গাড়ি আটকে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, লিখিত অভিযোগ ছাড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। তবে একই সঙ্গে তারা স্বীকার করছেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ ঘটনাগুলোকে “অপ্রত্যাশিত ও অগ্রহণযোগ্য” বলে মন্তব্য করেছেন, যদিও ইউজিসির সরাসরি হস্তক্ষেপের সীমাবদ্ধতার কথাও জানিয়েছেন।
শিক্ষক সংগঠনগুলো এসব ঘটনাকে সরাসরি ‘মব জাস্টিস’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অপরাধ বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করতে হবে, ক্যাম্পাসে অপমান বা সহিংসতার মাধ্যমে নয়। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের সংস্কৃতি এখন আরও সহিংস রূপ নিয়েছে এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাই এ ধরনের ঘটনার পেছনে বড় কারণ।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষক–শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবনতি, দলীয় ছাত্ররাজনীতির প্রভাব এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা মিলেই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব বিচারব্যবস্থার, ছাত্রদলের নয় এই নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট না হলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ আরও বাড়বে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
