“ক্যাঙ্গারু কোর্ট”—আইনের ভাষায় এটি কোনো বৈধ বিচারব্যবস্থা নয়; বরং ন্যায়বিচারের ছদ্মবেশে পরিচালিত এক অবৈধ, তড়িঘড়ি, পক্ষপাতদুষ্ট ও প্রহসনমূলক বিচার। শব্দটি এসেছে ইংরেজি প্রবাদ থেকে, যেখানে বোঝানো হয় বিচার এমনভাবে “লাফিয়ে লাফিয়ে” এগোয় যে সত্য ও প্রমাণের স্থির ভূমিতে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগই থাকে না। বিচারক, আসামি বা প্রক্রিয়া—সবকিছুই পূর্বনির্ধারিত। ফলাফলও সাধারণত একই—অন্যায়ের বিজয়, বিচারের পরাজয়।
যে সমাজে আইনের শাসন বিপর্যস্ত হয়, যেখানে আদালতের বদলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মতামতই হয়ে ওঠে ‘রায়’, সেখানে ক্যাঙ্গারু কোর্ট জন্ম নেয়। এটি কখনো রাজনৈতিক প্রতিশোধ, কখনো সামাজিক প্রভাব, কখনো আবার শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে সমাজে যে বার্তাটি স্পষ্ট হয় তা হলো—আইন সবাইকে রক্ষা করতে পারে না, বরং ক্ষমতাবানদের ইচ্ছাই চূড়ান্ত।
গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা। অথচ ক্যাঙ্গারু কোর্ট এগুলোর সবকিছুকেই আঘাত করে।
• এটি সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা নষ্ট করে।
• বিচারব্যবস্থাকে অকার্যকর প্রমাণ করে।
• নিরপরাধ মানুষকে হয়রানির সুযোগ তৈরি করে।
• সমাজে প্রতিশোধ, বিভাজন ও অস্থিরতা বাড়ায়।
সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে—ক্যাঙ্গারু কোর্ট কখনো সংগঠিত অপরাধীদের পক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, আবার নিরীহ মানুষকে শিকার বানায়। এভাবে এটি সমাজের নৈতিক কাঠামোকে ভিতর থেকে ধ্বংস করে।
আজকের যুগে ক্যাঙ্গারু কোর্ট শুধু মাঠে–ময়দানে বা কোনো গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিযোগ উঠলেই অনেকেই বিচার শেষ করে ফেলেন—প্রমাণ ছাড়াই, তথ্য যাচাই ছাড়াই।
একটি ভিডিও, একটি পোস্ট বা কারও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিবৃতি মুহূর্তেই চরিত্রহনন, অপমান কিংবা সামাজিক বিচারের হাতিয়ার হয়ে যাচ্ছে।
এ ধরনের “ডিজিটাল ক্যাঙ্গারু কোর্ট” গণমাধ্যমের উপরও চাপ সৃষ্টি করছে, জনমতকে ভুল পথে পরিচালিত করছে এবং সত্যকে আড়াল করছে।
একটি সভ্য দেশে বিচারকের কাজ করবে আদালত—সামাজিক গোষ্ঠী নয়, রাজনৈতিক শক্তি নয়, আর কোনোভাবেই সোশ্যাল মিডিয়া নয়।
ক্যাঙ্গারু কোর্ট বন্ধ করতে হলে—
• আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে,
• বিচারব্যবস্থাকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে,
• জনগণের আইনি সচেতনতা বাড়াতে হবে,
• আর গণমাধ্যমকে সত্য যাচাইয়ের দায়িত্ব আরও জোরদার করতে হবে।
ন্যায়বিচার সভ্যতার মেরুদণ্ড। সেই মেরুদণ্ড যদি ভেঙে যায়, তাহলে রাষ্ট্র কোনোভাবেই সঠিকভাবে দাঁড়াতে পারে না। ক্যাঙ্গারু কোর্ট তাই শুধু একটি শব্দ নয়—এটি অন্যায়, অত্যাচার ও অরাজকতার প্রতীক। সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোতে ফিরিয়ে আনতে হলে এই ভুয়া বিচারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আইনের শাসনে দৃঢ় বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা আজ জরুরি।
