নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় ওসির সামনেই এক পুলিশ উপপরিদর্শককে (এসআই) পুড়িয়ে হত্যার দাবি ঘিরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত সহিংসতা, পুলিশ হত্যা এবং সে–সংক্রান্ত দায়মুক্তি অধ্যাদেশ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নেতার প্রকাশ্য বক্তব্য এবং এরপরও পুলিশের কোনো দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ না নেওয়াকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি শায়েস্তাগঞ্জে ‘ডেভিল হান্ট ফেজ–২’ অভিযানে আটক ছাত্রলীগের এক সাবেক নেতাকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালামের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসান। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
যে পরিকল্পনায় ছাড়িয়ে নিয়ে আসা হয়
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সদস্য সচিব ও আন্দোলনকালীন সময়কালের সমন্বয়ক মাহদী হাসানের সাথে বানিয়াচংয়ের এক সমন্বয়কের কথপোকথনের একটি স্কিনশর্ট চ্যানেল১৪-এর কাছে এসেছে।
মাহদী হাসান ওসি’কে হুমতি ও ভয় দেখিয়ে চলে যাওয়ার পরে সেখানের পরিস্থিতির আপডেট দিয়ে বানিয়াচংয়ের সমন্বয়ক জানান, ‘ওসি মাফ চেয়েছে, (ওসিকে) লাস্ট ওয়ার্নিং দিয়ে এসেছি। সেখানে এএসপি এসেছে, তারপরে সবাই ঠান্ডা হয়েছে’।
এভাবে প্রকাশ্যে পুলিশ হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করার পরে ভয়ের কাছে নত স্বীকার করে পুলিশ প্রশাসন।
যা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও।
ভিডিওতে মাহদী হাসানকে বলতে শোনা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কারণেই বর্তমান প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় বানিয়াচং থানায় অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশের এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় তাঁরাই জড়িত ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকালে বানিয়াচং উপজেলার কলিমনগর এলাকা থেকে এনামুল হাসান নয়ন নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় নেওয়া হয়। নয়ন শায়েস্তাগঞ্জ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহসভাপতি ছিলেন। দুপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা থানায় গিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে সদর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার শহিদুল হক মুন্সীর মধ্যস্থতায় নয়নকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মাহদী হাসানের দাবি, নয়ন আগে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও জুলাই আন্দোলনের সময় সংগঠন থেকে বেরিয়ে এসে তাঁদের সঙ্গে সম্মুখ সারিতে আন্দোলনে অংশ নেন। এ সংক্রান্ত ছবি ও ভিডিও দেখানোর পর পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়।
শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালাম জানান, নয়নের জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ততার তথ্য উপস্থাপন করা হলে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পর এসআই সন্তোষ চৌধুরীর হত্যাকাণ্ড
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বানিয়াচংয়ে পুলিশের গুলিতে অন্তত আটজন গ্রামবাসী নিহত হওয়ার পর হাজার হাজার মানুষ থানা ঘেরাও করে। এ ঘটনার পর বানিয়াচং থানায় সংঘর্ষ, অস্ত্র লুট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিয়ে সে সময় বিবিসি বাংলা একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, থানা আক্রমণের একপর্যায়ে অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্য থানার ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। দিনভর সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে উত্তেজিত জনতার দর–কষাকষির পর গভীর রাতে পুলিশ সদস্যদের উদ্ধারের সময় এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে বাছাই করে জনতার হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে তাঁকে থানা চত্বরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরদিন তাঁর মরদেহ থানার সামনে একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে বিক্ষুব্ধ জনতা সব পুলিশ সদস্যকে হত্যার হুমকি দিলেও একপর্যায়ে সন্তোষ চৌধুরীকেই একমাত্র দাবি হিসেবে সামনে আনে। সেনাবাহিনীর সহায়তায় বাকি পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করা হলেও তাঁকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সে সময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, কয়েক মিনিট দেরি হলে থানার ভেতরে অবরুদ্ধ পুলিশ সদস্যদের শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল। এসআই সন্তোষ চৌধুরীর বিরুদ্ধে সেদিন গুলি চালিয়ে গ্রামবাসী হত্যার অভিযোগ ওঠে। তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ থাকার কথা বিভিন্ন পক্ষ উল্লেখ করেছে। আবার কেউ কেউ বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে সক্রিয় ভূমিকার কারণেও একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিল।
এসআই সন্তোষ চৌধুরী ছিলেন পরিবারের একমাত্র সন্তান। মৃত্যুর ১০ মাস আগে তাঁর বিয়ে হয়। মৃত্যুর তিন মাস পর তাঁর একটি সন্তান জন্ম নেয়। পরিবার আজও প্রশ্ন তুলছে, সেনা ও প্রশাসনের উপস্থিতির মধ্যেও কেন তাঁকে রক্ষা করা গেল না।
বানিয়াচং থানায় হামলা ও এসআই হত্যার ঘটনায় গত বছরের ২২ আগস্ট পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। তবে প্রায় এক বছর পার হলেও মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি এবং কোনো গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
আইন ও মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা একটি নির্দেশনার মাধ্যমে জুলাই–আগস্টের ঘটনাবলিতে জড়িতদের একপ্রকার দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, যা তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, কোনো ফৌজদারি অপরাধে দায়মুক্তি দেওয়া সাংবিধানিকভাবে টেকসই নয়। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের সহিংসতায় বাংলাদেশ পুলিশের অন্তত ৪৪ জন সদস্য নিহত হন। বিভিন্ন স্থানে থানায় বা প্রকাশ্যে পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার ও তদন্তে অগ্রগতি না থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ওসির সামনে এসআই হত্যার প্রকাশ্য দাবির পরও তাৎক্ষণিক কোনো আইনি পদক্ষেপের তথ্য না থাকায় দায়মুক্তি অধ্যাদেশ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সীমাবদ্ধতা আবারও আলোচনায় এসেছে।
