নিজস্ব প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র যাচাই–বাছাইয়ের পর্যায়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র ব্যাপকভাবে বাতিল হওয়ার ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা অভিযোগ করছেন, কমিশন ভোটার তথ্য সরবরাহ না করায় এবং তথ্য যাচাইয়ের কোন কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় তারা প্রতিকূল অবস্থার শিকার হচ্ছেন।
এ ব্যাপারে বিভিন্ন জেলা ও আসনে শনিবার (৩ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত মনোনয়ন যাচাই–বাছাইয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের ঘটনা নজরে এসেছে, যেখানে তথ্যগত ত্রুটি, ভিন্ন ভিন্ন ভোটার তথ্য ও কমিশনের অনলাইন ডেটাবেসের অসঙ্গতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে দাবি উঠেছে।
রাজনীতিক ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অভিযোগ
ঢাকা–৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা বলেছেন, নির্বাচন কমিশন ভোটার কোন আসনের—এ তথ্য জানার কোনো কার্যকর উপায় দেয় না। চেয়েছিলেন সাধারণ মানুষকেও ভোটার তথ্য উঠে দেখার; কিন্তু ভুল হলে পুরো দায় প্রার্থীর ওপর চাপানো হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তাসনিম জারার মতে, একজন প্রস্তাবক ও সমর্থক স্বাক্ষরকারী নিজেও জানতেন না তিনি ওই আসনের ভোটার—তবে অনলাইন ডেটাবেসে তাকে অন্য জেলার ভোটার দেখিয়েছে—এ কারণে তাঁর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। তিনি বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।
এই অভিযোগের সঙ্গে মিল রয়েছে আরও অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থীর বক্তব্যে, যাঁরা বলছেন—নির্বাচন কমিশন থেকে কোনো নির্ভরযোগ্য ভোটার তথ্য সরবরাহ না হওয়ায় ভুল ও অযথা মনোনয়ন বাতিলের ঝুঁকি বাড়ছে।
খুলনা-৩ ও নীলফামারীতে স্বতন্ত্র মনোনয়ন বাতিল
ত্রয়োদশ নির্বাচনে মনোনয়ন যাচাইয়ের প্রথম পর্যায়ে বিভিন্ন আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
খুলনা-৩ আসনে তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়—তাদের মধ্যে কারও কারও ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটার স্বাক্ষরের তথ্য ভুল এবং কারও ক্ষেত্রে ঋণ খেলাপি ও অন্যান্য অসঙ্গতি দেখানো হয়েছে বলে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় জানায়।
নীলফামারী-১ ও নীলফামারী-২ আসনে মোট তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে—এ প্রতিবেদনেও উল্লেখ থাকে যে, ভোটারদের দেওয়া স্বাক্ষর সঠিকভাবে যাচাই করা যায়নি।
উল্লেখ্য, এসব মনোনয়ন বাতিলের ক্ষেত্রে স্থানীয় রিটার্নিং কর্মকর্তা জানিয়েছে, প্রার্থীরা মনোনয়নপত্রে যে এক শতাংশ ভোটারের তালিকা দিয়েছেন, সেখানে ভুল তথ্য বা স্বাক্ষরের অনুপস্থিতি পাওয়ায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ব্যাপক পরিসরে স্বতন্ত্র মনোনয়ন বাতিলের ধারা
এর আগেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে নির্বাচন কমিশনের মনোনয়ন যাচাইতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতি প্রতিযোগিতামূলক উচ্চ বাতিলের হার লক্ষ্য করা গেছে। প্রাক্তন নির্বাচনী বাছাইকালে কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরমনোনয়ন বাতিলের হার প্রায় ৫৮ শতাংশ—বৃহত্তর সংখ্যক বাতিল হওয়া মনোনয়নপত্র স্বতন্ত্র প্রার্থীর ছিল। এই সংখ্যা স্বতন্ত্র অংশগ্রহণকারীদের চলমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও তথ্যগত ভুলের প্রতিফলন হিসেবে বিশ্লেষিত হয়েছে।
এতে দেখা গেছে, বড় পরিসরে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের অন্যতম সাধারণ কারণ ছিল এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের সঙ্গে ত্রুটি/মেল না থাকা, ঋণ খেলাপি/ঋণ–বিদ্যুৎ–গ্যাস বিল ডিফল্ট এবং অন্যান্য তথ্যগত ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য।
নির্বাচন কমিশন কি তথ্য দিচ্ছে?
নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা এবং তার সরকারি কর্মপরিকল্পনা ও বিজ্ঞপ্তি, ভোটার নিবন্ধন সম্পর্কিত তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করে থাকে; তবে ভোটার তথ্যের আসনভিত্তিক ডেটা সরাসরি নাগরিক বা প্রার্থীদের জন্য স্বচ্ছভাবে প্রবেশযোগ্য কিনা—সেটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা প্রশ্ন তুলছেন। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব পোর্টাল তথ্যপ্রদর্শন করে থাকলেও ওই তথ্য সাজানো বা ব্যবহারযোগ্য আকারে না থাকায় ত্রুটি, ভুল বা অস্পষ্টতার সুযোগ তৈরি হচ্ছে দাবি করছেন প্রার্থীরা।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আপিলের সুযোগ
মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীদের জন্য আপিল করার সুযোগও দেওয়া হচ্ছে। সাধারণত চলে ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল গ্রহণ, এবং ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল নিষ্পত্তির সময় রেখেছে নির্বাচন কমিশন—যেমন বিভিন্ন আসনে বাছাই-পর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রার্থীরা উপযুক্ত ডকুমেন্ট ও প্রমাণ দিয়ে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারছেন এবং মনোনয়ন ফিরিয়ে পেতে চাইছেন।
প্রশ্ন, সন্দেহ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের ব্যাপকতা ও তথ্যগত অসঙ্গতির অভিযোগ—বিশেষ করে ভোটার তথ্য না পেলেও দায় প্রার্থীর ওপর চাপানোর ধারা—নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, প্রস্তুতি ও তথ্যব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। কিছু পর্যবেক্ষক ভাবছেন, যখন বড় স্বতন্ত্র বা সংখ্যালঘু/বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়ে যাচ্ছে, সেখানে রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে সন্দেহও জন্ম নিচ্ছে।
এছাড়া সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংবাদে জানা গেছে, গণপ্রার্থীর মধ্যে একটি প্রভাবশালী হিন্দু নেতার মনোনয়নও গোপালগঞ্জ-৩ আসন থেকে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাদ দেওয়া হয়েছে—যা সংখ্যালঘু অধিকার ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
