লেখকঃ হুমায়ূন কবীর ঢালী
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গনে আরেকটি নাটকীয় পালাবদল ঘটে গেল। মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর আগেই দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্পিকারের উদ্দেশ্যে নিজের স্বাক্ষরযুক্ত পত্র পাঠিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। যদিও পদত্যাগপত্রটির বাহ্যিক রূপ দেখে মনে হয়েছে প্রক্রিয়াটি কিছুটা অপ্রত্যাশিত বা দ্বিতীয় কোনো পক্ষের চাপ ছিলো, কারণ কম্পিউটার কম্পোজ করা মূল পত্রে হাতে লিখে সালাম ও শ্রদ্ধা জানানোর বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়। এর পাশাপাশি পত্রে কিছু বানানগত ত্রুটিও পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে এসব আনুষ্ঠানিকতার বাইরে তাঁর সদ্য জমা দেওয়া পদত্যাগপত্রে তিনি যে মূল কারণগুলো তুলে ধরেছেন, তার মধ্যে রয়েছে তাঁর গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা। তিনি উল্লেখ করেছেন যে তিনি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছেন। এছাড়া তাঁর হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে এবং সম্প্রতি ‘Autonomic Neuropathy’ নামক রোগ শনাক্ত হওয়ায় তিনি মাঝে মাঝে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। শারীরিক ও মানসিক এই চরম অক্ষমতা এবং সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ীই তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতির এই বিদায়কে কেবল একজন সাংবিধানিক প্রধানের পদত্যাগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত বিগত কয়েক বছরের রক্তাক্ত রাজনৈতিক পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক কূটনীতির নতুন মারপ্যাঁচ এবং দেশের ক্ষমতার কাঠামোর গভীর রূপান্তরের একটি অনিবার্য পরিণতি। এই বিদায়ের নেপথ্যে বহুস্তরীয় কারণ সক্রিয় রয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের অভিঘাত, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের আঞ্চলিক কূটনীতি এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের রাজনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশ।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। এর আগে তিনি জেলা ও দায়রা জজ, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার এবং একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। বিরোধী দলগুলোর বয়কট ও নির্দলীয় প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতির কারণে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এই সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক ও আধা-প্রতীকী হলেও, রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার বাইরে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তাঁর একটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। প্রায় তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালনের পর তাঁর মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে যে রাজনৈতিক শক্তির আশ্রয়ে তিনি বঙ্গভবনে প্রবেশ করেছিলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দায়িত্ব নেওয়া প্রশাসনের মেটিকুলাস ডিজাইনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই তাঁর এই পদে টিকে থাকা নিয়ে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মেটিকুলাস ডিজাইনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে যায়। আন্দোলনকারীরা শুরু থেকেই রাষ্ট্রপতির অপসারণের দাবি তুললেও, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং বড় ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা এড়ানোর স্বার্থে তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে অপসারণের উদ্যোগ নেয়নি। কারণ, স্বয়ং মো. সাহাবুদ্দিনকেই ছাত্র-জনতার দাবির মুখে তৎকালীন সংসদ বিলুপ্ত করতে হয়েছিল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে শপথ পড়াতে হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোতে স্বাক্ষর করতে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো মেয়াদ জুড়েই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরকারের একধরনের শীতল লড়াই ও দূরত্ব বজায় ছিল। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইউনূস আমলের শেষ দিকে চরম অপমান ও অসম্মানের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে জানান যে তাঁর বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়া হয়েছিল এবং বঙ্গভবনের প্রেস টিম গুটিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মোড় নেয় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। শক্তিশালী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনই নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর মন্ত্রিসভাকে শপথবাক্য পাঠ করান। প্রাথমিকভাবে বিএনপি সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রপতি ও নতুন সরকারের মধ্যে একটি সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক দৃশ্যমান হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ এবং ঈদের নামাজে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে একসঙ্গে দেখা যাওয়া, জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া এবং গত মে মাসে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার ঘটনাগুলো প্রমাণ করছিল যে, নতুন সরকার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় নমনীয় মনোভাব পোষণ করছে।
তবে রাষ্ট্রপতির যুক্তরাজ্য বা লন্ডন সফর থেকে ফেরার পরই সম্পর্কের মোড় ঘুরে যায়। দেশের একটি প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার দাবি করেছিল যে, লন্ডন অবস্থানকালে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি ভারতে অবস্থানরত তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করেছিলেন। মো. সাহাবুদ্দিন এই তথ্যকে সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত বলে উড়িয়ে দেন এবং নিরপেক্ষ অনুসন্ধানেও এর সত্যতা মেলেনি। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জনের দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিএনপির নীতিনির্ধারক মহলে এই অস্বস্তি তৈরি হয় যে রাষ্ট্রপতি হয়তো পর্দার আড়ালে অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।
সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তন ঘটে যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সাক্ষাৎকারে ঘোষণা দেন যে, তিনি এবং তাঁর দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা আগামী ডিসেম্বরের দিকে প্রবাস জীবন থেকে দেশে ফিরে আইনগতভাবে আত্মসমর্পণ করবেন। গত বছরের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল এক রায়ে শেখ হাসিনাকে ছাত্র-জনতার ওপর দমনপীড়ন চালানোর অভিযোগ তুলে তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছিল। এই ঘোষণায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত ও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করলে, বর্তমান তারেক রহমান সরকারের ওপর এটি বিশাল রাজনৈতিক ও জনমতের চাপ সৃষ্টি করে। সরকারের অন্দরে এই আশঙ্কা দানা বাঁধে যে, বঙ্গভবনে বসে থাকা আওয়ামী লীগ আমলের মনোনীত রাষ্ট্রপতি শেষ মুহূর্তে সরকারের জন্য বড় ধরনের আইনি বা রাজনৈতিক বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারেন। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে এবং আগামী ৩০ জুলাই ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের তিন দিনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা সফরকে সামনে রেখে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার যৌক্তিকতা পর্যালোচনার পাশাপাশি মার্কিন বিশেষ দূতের কাছে রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বার্তা পৌঁছানোর গুঞ্জন এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের আঞ্চলিক কূটনীতির মারপ্যাঁচে এবং সার্জিও গোরের ঢাকা পৌঁছানোর আগেই সরকার ও প্রশাসনের অন্দরে দ্বৈত ক্ষমতার কেন্দ্র দূর করতে এই পদত্যাগ নিজেদের সুরক্ষা এবং কৌশলগত বলে মনে করা হচ্ছে।
দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্য এই পদত্যাগ কোনো ইতিবাচক সুফল বয়ে আনবে, নাকি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে—তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। রাষ্ট্রপতি সরে দাঁড়ানোর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বঙ্গভবন থেকে যেকোনো অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা দ্বৈত ক্ষমতার সম্ভাবনা দূর করে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নিজের স্বাক্ষরযুক্ত পত্র স্পিকারের কাছে দিয়েছেন এবং ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন।
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন তা নিয়ে জল্পনা শুরু হলেও, বিএনপি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে তারা দলীয় কাঠামোর বাইরে কোনো আমলাকে এই পদে দেখতে চায় না। দলের জ্যেষ্ঠ ও পরীক্ষিত কোনো নেতাকে এই পদে বসানোর সম্পূর্ণ এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এই নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
পরিশেষে, রাষ্ট্রপতির এই বিদায় প্রমাণ করে যে ২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশে অতীতের কোনো রাজনৈতিক কাঠামোর অবশিষ্টাংশ ক্ষমতার কাছাকাছি না রেখে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত ও সুসংহত করতে চাচ্ছেন তারেক রহমানের সরকার।
একইসঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা এবং মার্কিন দূতের সফরকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক চাপ থেকে নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত রাখতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই নতুন সাংবিধানিক অধ্যায় দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে কতদূর সুদৃঢ় করবে বা নতুন কোনো মেরুকরণের জন্ম দেবে, তা নির্ধারণ করবে আগামী দিনগুলো।