লেখকঃ ড. জেবউননেছা,অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
গত বছর এই দিনে দুপুরে পেশাজীবি নারী সমাজের ডেইজি আপা কান্নাজড়িত কন্ঠে জানালেন, মাহফুজা ম্যাম নেই। আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। সাথে সাথে ছুটে যাই ম্যামের বাসায়। ম্যামের বাসায় গিয়ে দেখি ম্যাম ফ্রিজিং ভ্যাণে। আমি নিরবে কাঁদতে পারিনা। হাউমাউ করে না কাঁদলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। ম্যামের বাসায় তাই করলাম।কিছুক্ষণ পর আবেগ সংবরণ করে ডেইজি আপা আর আমি মিলে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি কম্পোজ করলাম। অইদিন ম্যামকে ফ্রিজিং ভ্যাণে তার বাড়িতেই রাখা হয়। পরদিন ভোর সকালে চলে যাই ম্যামের বাসায়। সেখানে গিয়ে ম্যামের পাশে সূরা ইয়াসীন সহ অন্যান্য সূরা পাঠ করি। ম্যামের বড় ছেলে ডা. মাহফুজ ভাইকে বললাম, ভাইয়া শোক বই করা দরকার। শহিদ মিনারে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ভাইয়া শোক বইয়ের ব্যবস্থা করলেন।এরপর ম্যামকে নিয়ে যাওয়া হয় শহিদ মিনারে।রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ম্যামকে সম্মান জানানো হয়। সর্বস্তরের মানুষ ম্যামকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান। এরপর ম্যামকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ভবনে। সেখানে ও সম্মান জানানো হয়। আমি বক্তব্য রাখার সময় বলেছিলাম, ডাকসু ভবনের অভ্যন্তরে ম্যামের একটা ভাষ্কর্য রাখতে। দু:খজনক হলেও সত্যি সেদিন ডাকসু প্রতিনিধিরা শহিদ মিনারে ও যায়নি, ডাকসু ভবনের সামনেও আসেনি। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও আসেননি শ্রদ্ধা জানাতে। আমি কিন্ত অবাক হইনি। কারণ, তখন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পড়ানোর মৌসুম চলছিল, বীর দর্পে মুক্তিযুদ্ধের ভাষ্কর্য ভাঙ্গার হিড়িক চলছিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে টানাটানি চলছিল। তা সত্ত্বেও বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক ডাকসু ভিপি শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক মাহফুজা খানম ম্যামের প্রতি মানুষের যে সম্মান দেখেছি তা অভূতপূর্ব।
ডাকসু ভবন থেকে সর্বস্তরের মানুষের সমস্ত ফুল বেশ কয়েকটি রিকশা করে পাঠিয়ে দেই আজিমপুর কবরস্থানে। আমিও যাই সাথে। এরপর ম্যামকে আজিমপুরে সমাহিত করা হয়। এভাবেই অবসান ঘটে একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিকের বর্ণাঢ্য জীবন।
শেষ হয়েও হয়না শেষ। মাহফুজা খানম ম্যামের মত মানুষ একজনই আসেন। দেশের দু:সময়ে তাঁর চোখে অবিরত অশ্রু ঝরতে দেখেছি। আমার হাতটা ধরে বলতেন, “জেবুন সব ঠিক হয়ে যাবে তো? আমি বলতাম, ম্যাম সব ঠিক হয়ে যাবে। একটু সময় লাগবে।
ম্যাম আমার জীবনে একজন আদর্শ। আমার বাড়ির অতিথি কক্ষের দেয়ালে আমার লেখা বই হাতে ম্যামের ছবি ঝুলানো রয়েছে। কারণ আমার দুইটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচনে ম্যাম ছিলেন বিশেষ অতিথি। আমার কাছে ম্যাম এখনো জীবিত। ম্যামের সাথে আমার শত শত স্মৃতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, গণ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, প্রেস ক্লাব, এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বাংলাদেশ, বাংলা একাডেমি, পেশাজীবি নারী সমাজ, ঢাকা বিজনেস এন্ড প্রফেসনাল উইমেন্স ক্লাব সহ ম্যামের বাসার খাবার টেবিল পর্যন্ত রয়েছে আমার স্মৃতি। যা এক লেখায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
অধ্যাপক মাহফুজা খানম ম্যাম আমাকে শিখিয়েছেন, বিনয় ও নম্রতা মানুষকে অনেক বড় করে। ছোট বড় সকলকে শ্রদ্ধা করা মানুষের ভাল গুণের একটি অংশ। সেই সাথে সৎ থাকা জরুরী। শিখিয়েছেন, সংসার,সন্তান মেয়েদের ক্যারিয়ারের একটা বড় অংশ। সংসার ঠিক থাকলে সব ঠিক। একজন আপাদমস্তক সকলের প্রিয় মাহফুজা ম্যাম। যার প্রতিটি নিশ্বাসে ছিল দেশ আর দেশের জন্য ভালবাসা।
ম্যামের সাথে ২১ জুলাই, ২০২৫ এ ঢাকা বিজনেস এন্ড প্রফেসনালস উইমেন্স ক্লাবের নতুন কমিটির অভিষেক সভায় গিয়েছিলাম। যা ছিল ম্যামের সাথে শেষ স্মৃতি। মনে পড়ে, মিটিংয়ে কমিটির সবার সামনে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, Real patriot বলে। মিটিং শেষে ম্যামের সাথে যাই অফিসার্স ক্লাবে। ম্যাম সুইমিং এ ভর্তি হবেন তাই।ওখান থেকে ম্যাম আমাকে নামিয়ে দেন দোয়েল চত্বরে। গাড়ি থেকে নামার আগে বললেন,টিপ খুলে ফেল। মাথায় কাপড় দাও। মুখে মাস্ক দাও। ম্যামের যুক্তি ছিল এরকম শোকের আমেজে সাজগোজ করে যাওয়া ঠিক হবেনা। কারণ, সেদিন মাইলষ্টোন স্কুল এন্ড কলেজের বিমান দুর্ঘটনায় আহতদের জন্য ঢাকা মেডিকেল রক্ত সংগ্রহ করছিল। আমিও একজন রক্তদাতা হিসেবে গিয়েছিলাম।গাড়ি থেকে নামার সময় ম্যামের পা ছুঁয়ে বলেছিলাল, ম্যাম আমার জন্য দোয়া করবেন। ম্যাম বলেছিলেন, দেশের মানুষের জন্য যাচ্ছো, যাও। দোয়া রইল। এই ছিল শেষ দেখা। বাসায় ফিরে ম্যামকে ফোন দিয়ে বলেছিলাম, ম্যাম বাসায় পৌছেছি। কে জানত সেই দেখার ঠিক ২১ দিন পর ম্যামের জন্য প্রেস বিজ্ঞপ্তি আমাকেই লিখতে হবে। শহিদ মিনার থেকে নিরবে হেঁটে হেঁটে ডাকসু ভবনে গিয়ে ম্যামকে শ্রদ্ধা জানাতে হবে। পেশাজীবি নারী সমাজ আয়োজিত ছায়ানট মিলনায়তনে সংগঠনটির যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে ম্যামের জীবন ও কর্ম নিয়ে আমাকে পাঠ করতে হবে। অত:পর এই স্মৃতিগুলো নিয়ে বয়ে বেড়াতে হবে। মাহফুজা ম্যাম ও তার স্বামী প্রয়াত ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ স্যারের স্মরণে গঠিত হয়েছে “ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ও প্রফেসর মাহফুজা খানম স্মৃতি পরিষদ’। যে স্মৃতি পরিষদের আহবায়ক ম্যামের বড় ছেলে ডা. মাহফুজ শফিক এবং সদস্য সচিব ছোট ছেলে ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক। এই পরিষদের আমি একজন সদস্য। ভেবেছিলাম, ম্যাম নেই। ম্যামের বাড়ির প্রধান দরজা বোধ হয় আমার জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কিন্ত না, ম্যামের ছেলেমেয়েরা দরজা খোলা রেখেছেন। যেখানে আমি যেতে পারি। ম্যামের ছবিগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে ম্যামের শোবার ঘর পর্যন্ত যেতে পারি। ম্যামের দুই ছেলে এবং ম্যামের একমাত্র মেয়ে ডা. মাশরুরা শফিক যেন ম্যামের আর এক প্রতিবিম্ব। তারা ও জানেন,ছোট-বড় সকলকে সম্মান করতে। তারা ও হয়েছেন ম্যামের মতই নিরহংকার এবং ভীষণ বিনয়ী। ম্যামের ৭০ বছর জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে স্মারক গ্রন্থে ম্যামকে নিয়ে আমার লেখার শিরোনাম ছিল, “আমার আদর্শ মাহফুজা আপা’। হ্যাঁ,আমার আদর্শ মাহফুজা ম্যাম । ম্যাম আমার ভীষণ শ্রদ্ধার সম্মানের। আমাকে তিনি সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেন Real Patriot বলে। জানিনা আমি Real Patriot হতে পেরেছি কিনা, পারব কিনা। তবে মাহফুজা ম্যামকে ছুঁয়ে বলেছিলাম, ‘ম্যাম আমি আমার দেশটাকে নিজের চেয়ে বেশি ভালবাসি। যদি জীবন দিতে হয় দিয়ে দিব। তবু অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়াবনা। ‘আজ এক বছর হলো, ম্যাম চলে গিয়েছেন। কিন্ত ম্যামকে দেয়া প্রতিশ্রুতি এখনো ভংগ করিনি।করব ও না ইনশাআল্লাহ!
মাহফুজা খানম ম্যামেরা হারায়না, বইয়ের পাতায়, ইতিহাসের খাতায়, সুজলা সুফলা দেশের বাতাসে, পূর্ণিমার আকাশে, দিনের প্রখর আলোয় উপস্থিতি থাকে ম্যামদের স্মৃতি।
সাবেক ডাকসু ভিপি বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক মাহফুজা খানম ম্যামের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি, মহান আল্লাহ যেন ম্যামকে জান্নাতবাসী করেন!
