হাসান মহমুদ টিপু
সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা
জুলাই আন্দোলন এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ, ইতিহাস ও অর্থনীতিতে যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তার নেপথ্যের চরিত্রগুলোর মধ্যে নাবিলা ইদ্রিস সম্ভবত সবচেয়ে কম আলোচিত নামগুলোর একটি। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে গুম-তদন্ত কমিশনকে ঘিরে তার ভূমিকা, প্রভাব এবং দ্রুত উত্থান তাকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে পরিণত করেছে।
৫ আগস্টের আগে সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অপরিচিত এই নারী অল্প সময়ের মধ্যেই গুম-তদন্ত কমিশনের অন্যতম আলোচিত ও প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে সামনে আসেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, নাবিলা ইদ্রিসের এই উত্থানের পেছনে কী ছিল? তার পেশাগত ও রাজনৈতিক পটভূমি কী? আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার শিক্ষা, কর্মজীবন ও বিভিন্ন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঘটনাগুলোকে কীভাবে দেখা উচিত?
নাবিলা ইদ্রিসের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কেও প্রকাশ্য তথ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত। বিভিন্ন লেখায় তিনি স্বামী বা জীবনসঙ্গীর কথা উল্লেখ করলেও দীর্ঘদিন তার পরিচয় প্রকাশ্যে স্পষ্ট ছিল না। এই গোপনীয়তাই তাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
শুরুটা কোথায়?
নাবিলা ইদ্রিসের প্রাথমিক জীবন ও বাংলাদেশে তার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। তবে জানা যায়, তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তারও আগে, মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি ‘কমিউনিটি অ্যাকশন’ নামে একটি এনজিও প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন।
প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নাগরিক সম্পৃক্ততা, নৈতিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এর ধর্মীয় ফ্রেমিং নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে ‘একটি হাসিও দান’ ধরনের ধর্মীয়ভাবে অনুপ্রাণিত বক্তব্যকে কেউ কেউ তার প্রাথমিক আদর্শিক অবস্থানের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন।
পরবর্তীতে তিনি সেভ দ্য চিলড্রেনে গবেষণা ও নীতি-সংক্রান্ত কাজ করেন। এই পেশাগত অভিজ্ঞতা তার আন্তর্জাতিক একাডেমিক ও নীতিনির্ধারণী পরিসরে প্রবেশের পথ তৈরি করে।
তার পারিবারিক রাজনৈতিক পটভূমি নিয়েও বিভিন্ন দাবি রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, তার পরিবারের কিছু সদস্য জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির কিংবা হিযবুত তাহরীরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসব দাবির ভিত্তিতে নাবিলার নিজের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান নিয়েও নানা প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের প্রত্যেকটির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য যাচাই আলাদাভাবে প্রয়োজন।
ইয়র্ক: উচ্চশিক্ষা, নাকি অন্য কোনো সংযোগের সূচনা?
নাবিলার জীবনের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্তরাজ্যের ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে তিনি সামাজিক নীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন।
এখান থেকেই তাকে ঘিরে শুরু হয় আরও বড় ধরনের জল্পনা। কিছু বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ইয়র্কে থাকাকালীন তার সঙ্গে কোনো পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ তৈরি হতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে তাকে ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে এই দাবির পক্ষে প্রকাশ্যে যাচাইযোগ্য প্রমাণ সীমিত। কোনো গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তার নিয়োগ বা গোপন সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন তথ্যও সামনে নেই।
তবু প্রশ্নটি থেকেই যায়: একজন তরুণ বাংলাদেশি এনজিওকর্মী কীভাবে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্য, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও কেমব্রিজের মতো ভিন্ন ভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত হলেন?
চীন অধ্যায়
নাবিলা ইদ্রিসের শিক্ষাজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় চীন। তিনি কমিউনিকেশন ইউনিভার্সিটি অব চায়নায় আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা ও যোগাযোগ নিয়ে পড়াশোনা করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৫ সালের দিকে চীনে মার্কিন গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক নিয়ে বড় ধরনের সংকটের খবর আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হচ্ছিল। চীনে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যদাতাদের নেটওয়ার্ক ধ্বংস হওয়ার ঘটনাও সেই সময়ে সামনে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে নাবিলার চীনে অবস্থানকে কিছু বিশ্লেষক কাকতালীয় হিসেবে দেখছেন না। তাদের যুক্তি, একজন বিদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে চীনের মিডিয়া ও যোগাযোগব্যবস্থার কেন্দ্রে অবস্থান করা তাকে সেখানকার রাষ্ট্র, প্রচারণা কাঠামো এবং তথ্য-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা দিতে পারে।
কিন্তু এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। চীনে পড়াশোনা করা এবং গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করা এক বিষয় নয়। এই দুইয়ের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের জন্য অতিরিক্ত প্রমাণ প্রয়োজন।
মালয়েশিয়া ও ‘খাজানাহ’ সংযোগ
নাবিলার জীবনের আরেকটি আলোচিত অধ্যায় মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাকে ‘ফর্মার খাজানাহ স্কলার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়।
মালয়েশিয়ার খাজানাহ স্কলারশিপ মূলত উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বিকাশের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৃত্তি কর্মসূচি। এই ধরনের আন্তর্জাতিক বৃত্তি কোনো ব্যক্তির পেশাগত নেটওয়ার্ক বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এই বৃত্তিকে সরাসরি গোয়েন্দা ‘গ্রুমিং মেকানিজম’ হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি প্রমাণের দাবি রাখে। কোনো বৃত্তি, আন্তর্জাতিক শিক্ষা বা পেশাগত নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়া নিজেই গুপ্তচরবৃত্তির প্রমাণ নয়।
তারপরও নাবিলার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য, চীন ও মালয়েশিয়ার ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সংযোগকে একটি বৃহত্তর ক্যারিয়ার প্যাটার্ন হিসেবে বিশ্লেষণ করার সুযোগ রয়েছে।
কেমব্রিজ: একাডেমিক পরিচয় থেকে নীতিনির্ধারণের দিকে
পরবর্তী সময়ে নাবিলা ইদ্রিস কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেন এবং বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ও নীতিনির্ধারণ নিয়ে গবেষণা করেন।
তার গবেষণা তাকে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক নীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি একাডেমিক পরিসরে নিয়ে যায়। তার পিএইচডির স্বীকৃতিপর্বে ‘Cambridge Ummah’ শব্দবন্ধ ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
কেউ এটিকে তার ধর্মীয় পরিচয়ের একটি স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবে দেখতে পারেন। আবার কেউ এটিকে বৃহত্তর আদর্শিক নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারেন।
কিন্তু একটি শব্দবন্ধ বা ব্যক্তিগত পরিচয় থেকে সরাসরি গোয়েন্দা-সম্পর্ক কিংবা রাজনৈতিক অপারেশনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যুক্তিগতভাবে দুর্বল। বরং এসব তথ্যকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে রেখে দেখা প্রয়োজন।
থাইল্যান্ড: একটি অদৃশ্য সেতু?
বাংলাদেশে ফেরার আগে নাবিলার থাইল্যান্ড-সংযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থাইল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং আঞ্চলিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। শীতল যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী সময় পর্যন্ত দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান তাকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
এই কারণে নাবিলার থাইল্যান্ড-ভ্রমণ বা অবস্থানকে কেউ কেউ সম্ভাব্য ‘স্টেজিং গ্রাউন্ড’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশে ফেরার আগে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় বা যোগাযোগের সম্ভাবনা ছিল কি না, সেই প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তবে এখানেও প্রমাণ এবং অনুমানের সীমারেখা পরিষ্কার রাখা জরুরি।
নাবিলা ইদ্রিসের স্বামী কে?
নাবিলাকে ঘিরে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তার স্বামী। বিভিন্ন সূত্রে তার স্বামীর নাম মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি কানাডার ইউনিভার্সিটি অব রেজাইনার ক্রিমিনোলজি বিভাগের একজন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে পরিচিত।
আসাদুল্লাহর শিক্ষাজীবনও আন্তর্জাতিক। তিনি সাইমন ফ্রেজার ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন এবং পরবর্তীতে ক্রিমিনোলজিতে একাডেমিক ক্যারিয়ার গড়েছেন।
তাকে ঘিরেও রাজনৈতিক ও আদর্শিক নানা অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তার ছাত্রজীবনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং পরবর্তীতে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের দাবি করা হয়েছে।
২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনের সময় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত সাক্ষাৎকার নেওয়ার বিষয়টিও তার বিরুদ্ধে সন্দেহের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, একাডেমিক গবেষণা এবং গোয়েন্দা তৎপরতার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার চেষ্টা
দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আসাদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন এবং বিভাগের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করেছিলেন।
কেন কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশে আসার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, সেটিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এর পেছনে ব্যক্তিগত, একাডেমিক কিংবা রাজনৈতিক কোনো কারণ ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু নাবিলা ও আসাদুল্লাহ দুজনের আন্তর্জাতিক একাডেমিক ক্যারিয়ার এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় তাদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।
গুম কমিশনে নাবিলার উত্থান
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অবশ্য এখানেই।
২০২৪ সালের আগস্টের আগে সাধারণ মানুষের কাছে নাবিলা ইদ্রিস খুব পরিচিত নাম ছিলেন না। অথচ সরকার পরিবর্তনের পর গুম-তদন্ত কমিশনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পান।
তার নিয়োগের প্রক্রিয়া, যোগ্যতার ভিত্তি এবং কমিশনের অভ্যন্তরে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি কমিশনের একজন সাধারণ সদস্যের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করেছেন।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, কমিশনের গোপন নথি ও তথ্য তার স্বামীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং সেসব তথ্য ব্যবহার করে কোনো নির্দিষ্ট ধরনের রিপোর্ট তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
এটি সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। তবে এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে নথি, তদন্ত এবং প্রামাণ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জরুরি।
গুমের সংখ্যা ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের প্রশ্ন
নাবিলার বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হলো, তিনি গুমের সংখ্যা এবং ঘটনাগুলোর ব্যাপ্তিকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করেছেন।
সমালোচকদের দাবি, গুমের ঘটনায় রাজনৈতিক পক্ষপাত কাজ করেছে এবং নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ঘটনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে প্রকৃত গুমের শিকার ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এখানে মূল প্রশ্নটি হওয়া উচিত: কমিশনের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং রিপোর্ট তৈরির পদ্ধতি কতটা স্বচ্ছ ছিল?
কোনো কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নয়, বরং তার প্রমাণ সংগ্রহের পদ্ধতি, তথ্য যাচাই, সাক্ষ্য গ্রহণ এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদনের নিরপেক্ষতার ওপর নির্ভর করে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও ক্ষমতার সীমা
নাবিলার ভূমিকা নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে।
অভিযোগ করা হয়েছে, গুম কমিশনের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে এমনভাবে অংশ নিয়েছেন, যেন তিনি প্রসিকিউশনের অংশ।
যদি সত্যিই এমন হয়ে থাকে, তাহলে তার সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার সীমা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একটি কমিশনের সদস্য হিসেবে একজন ব্যক্তির কী ধরনের তথ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং অন্য কোনো বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে তার ভূমিকার সীমা কোথায়, সেটি স্পষ্ট হওয়া দরকার।
একজন সংস্কারক, নাকি একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ?
নাবিলা ইদ্রিসকে নিয়ে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বয়ান তৈরি হয়েছে।
একটি বয়ানে তিনি সাহসী একজন সংস্কারক, যিনি দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ ও গুমের ঘটনাগুলোর অনুসন্ধানে কাজ করছেন এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনতে ভূমিকা রাখছেন।
অন্য বয়ানে তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যার উত্থানের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, আদর্শিক প্রভাব এবং সম্ভাব্য গোয়েন্দা সংযোগ কাজ করেছে।
দ্বিতীয় বয়ানটির ভিত্তি হিসেবে যুক্তরাজ্যে শিক্ষা, চীনে অবস্থান, মালয়েশিয়ার সঙ্গে সংযোগ, কেমব্রিজে গবেষণা এবং থাইল্যান্ডের সফরসহ বিভিন্ন ঘটনাকে একত্রে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনাগুলো সত্যিই একটি পরিকল্পিত গোয়েন্দা ক্যারিয়ারের অংশ ছিল, নাকি একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী একাডেমিক ও নীতিবিষয়ক কর্মীর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা, সেটিই আসল প্রশ্ন।
‘গুপ্তচর জীবনের’ আখ্যান কতটা বাস্তব?
নাবিলা ইদ্রিসকে নিয়ে যে ইংরেজি লেখাটি আলোচনায় এসেছে, তার শিরোনাম “The Covert Rise of Dr. Nabila Idris: A Spy Novel in Real Time”। লেখাটির নিজস্ব ভাষ্যেই এটি প্রচলিত অর্থে কোনো জীবনী নয়; বরং বিভিন্ন ঘটনা, সময়কাল ও পেশাগত সংযোগকে একত্র করে তৈরি একটি পুনর্গঠন।
এই পুনর্গঠনে একটি নির্দিষ্ট গোয়েন্দা-ট্রেডক্রাফটের কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে। তরুণ বয়সে আদর্শিক গঠন, আন্তর্জাতিক শিক্ষা, বিভিন্ন দেশে অবস্থান, নেটওয়ার্ক তৈরি এবং শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে প্রভাবশালী অবস্থানে ফিরে আসার ঘটনাগুলোকে একটি ধারাবাহিক অপারেশন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এই আখ্যান নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু আকর্ষণীয় আখ্যান এবং প্রমাণিত বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয়, আন্তর্জাতিক শিক্ষা, বিদেশি বৃত্তি, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, নির্দিষ্ট দেশে ভ্রমণ কিংবা কোনো পেশাগত নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগকে একত্র করে সরাসরি গুপ্তচরবৃত্তির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে আরও শক্ত প্রমাণ প্রয়োজন।
তবু নাবিলা ইদ্রিসের উত্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা অমূলক নয়।
তিনি কীভাবে এত দ্রুত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কমিশনে প্রভাবশালী হয়ে উঠলেন? তার নিয়োগের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল? কমিশনের অভ্যন্তরে তার প্রকৃত ক্ষমতার সীমা কতটুকু ছিল? তার হাতে আসা তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে? এবং তার আন্তর্জাতিক একাডেমিক ও পেশাগত নেটওয়ার্কগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কোনো ভূমিকা রেখেছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক অনুমান দিয়ে নয়, নথি, সাক্ষ্য, প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ড এবং স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করা দরকার।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু নাবিলা ইদ্রিসকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশের মতো একটি রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত দেশে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, কারা তাদের প্রভাবিত করছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে দৃশ্যমান ক্ষমতার বাইরে কোনো অদৃশ্য নেটওয়ার্ক কাজ করছে কি না।
নাবিলা ইদ্রিসের গল্প তাই কেবল একজন ব্যক্তির উত্থানের গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, আদর্শিক রাজনীতি এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে আরও বড় কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।
