লেখকঃ এবিএম সিরাজুল হোসেইন
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও সুশৃঙ্খল শিক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত ‘ক্যাডেট কলেজ’গুলোর মূল দর্শন, ইতিহাস এবং মনস্তত্ত্ব নিয়ে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিতর্কিত ও শোরগোল ফেলে দেওয়া পোস্ট ভাইরাল হয়েছে। উনিশ শতকে আমেরিকায় আদিবাসী আমেরিকানদের সাংস্কৃতিক রূপান্তরের জন্য তৈরি ‘কার্লাইল মডেল’-এর সাথে ক্যাডেট কলেজ ব্যবস্থার তুলনা টেনে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবিলম্বে বন্ধের জোরালো দাবি তোলা হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া ওই স্ট্যাটাসে উল্লেখ করা হয়, ১৮৭৯ সালে আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ায় রিচার্ড প্র্যাট নামের এক ব্যক্তি আদিবাসীদের মূল পরিচয় মুছে ফেলতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কার্লাইল ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল। প্র্যাটের বিখ্যাত এবং বিতর্কিত দর্শন ছিল—“ওদের ভেতরের আদিবাসী সত্তাকে হত্যা করতে হবে এবং মানুষটাকে বাঁচাতে হবে” (“Kill the Indian in him and save the man”)। অভিযোগ তোলা হয়েছে, পাকিস্তান আমলের সামরিক শাসকেরা ঠিক একইভাবে স্থানীয় বাঙালিদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভাবাবেগকে ‘আধা-হিন্দু’ বা অপরিপক্ক মনে করে তাদের বাঙালি সত্তা মুছে ফেলতে ক্যাডেট কলেজের মডেল প্রবর্তন করেছিল।
পোস্টে দাবি করা হয়, ক্যাডেট কলেজের এই বিতর্কিত মনস্তত্ত্বের ফলেই দেশপ্রেমিক নাগরিকের পরিবর্তে এক ধরনের বিচ্ছন্নতাবাদী মনস্তত্ত্ব গড়ে উঠছে, যা অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হয়ে উগ্রবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রমাণ হিসেবে বেশ কয়েকজন শীর্ষ জঙ্গি ও উগ্রপন্থী নেতার ক্যাডেট কলেজ ব্যাকগ্রাউন্ডের একটি তালিকা তুলে ধরা হয়।
তালিকায় হোলি আর্টিজান হামলার পরিকল্পনাকারী থেকে শুরু করে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার প্রতিষ্ঠাতা শামিন মাহফুজ (রংপুর ক্যাডেট কলেজ), সাইফুল্লাহ ওজাকি (সিলেট ক্যাডেট কলেজ), সাখাওয়াত কাওসার (মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ), আমিনুল ইসলাম বেগ (বরিশাল ক্যাডেট কলেজ), গাজী কামরুস সালাম সোহান (মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ) এবং নজিবুল্লাহ আনসারীর (রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ) মতো ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে দাবি করা হয়—এরা সবাই কোনো সাধারণ সন্ত্রাসী নয়, বরং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি যারা ক্যাডেট সিস্টেম থেকেই উঠে এসেছে।
স্ট্যাটাসটিতে আরও বলা হয়েছে, আমাদের সমাজে বিদ্যমান ভারতবিরোধিতা, ধর্মীয় চরমপন্থা এবং নিজস্ব মাটির সংস্কৃতিকে অস্বীকার করার এই বীজ মূলত এই শিক্ষাব্যবস্থা থেকেই রোপিত হচ্ছে। ক্যাডেট কলেজের পাশাপাশি এ দেশের কতিপয় মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাতেও ধর্ম শেখানোর নামে মার্কিন রিচার্ড প্র্যাটের প্রবর্তিত সাংস্কৃতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ার মগজধোলাই চালানো হচ্ছে বলে লেখক ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পোস্টটির শেষভাগে লেখক মন্তব্য করেন, “কিলার সাইকোপ্যাথ ও চরমপন্থী মানসিকতা তৈরি করা এই ক্যাডেট কলেজগুলো একদিন বন্ধ হবে এবং সেটাই এই জাতিকে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে রক্ষা করার জন্য সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হবে।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও সচেতন নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক বাদানুবাদ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
