লেখকঃ হুমায়ূন কবীর ঢালী
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বেলুচিস্তান কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, বরং এটি আত্মত্যাগ, লড়াই এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বাধীনতার এক প্রতীক। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ‘বেলুচিস্তান প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণার খবর এবং এর স্বপক্ষে উঠে আসা দাবিগুলো বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে স্বাধীনথাকামীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বা কার্যকর রাষ্ট্র গঠনের দাবির পক্ষে সরাসরি প্রমাণ মেলেনি, তবুও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দশকের পর দশক ধরে চলা রাষ্ট্রীয় বঞ্চনা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে এটি গণমানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক বিস্ফোরণ। বেলুচিস্তানের সংগ্রামের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন; ১৬৬৬ সালে মীর কাম্বার বালুচ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘কালাত খানাত’ বা ‘কালাত খেলাফত’ পরবর্তীতে ১৭৩৯ সালে আহমদজাই উপজাতির শাসনাধীনে এসে একটি সুসংহত রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। একসময় এই রাজ্যের সীমানা বর্তমান ইরান, আফগানিস্তান এবং সিন্ধু পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসন ও ১৮৩৯ সালের আক্রমণের মুখে এর সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হলেও, তারা নিজস্ব ঐতিহ্য ও শাসনকাঠামো অনেকাংশেই বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ১১ আগস্ট কালাত রাষ্ট্রটি স্বাধীন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ মীর আহমদ ইয়ার খান পাকিস্তানের নতুন ডোমিয়নের সাথে সংযুক্ত হওয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। বেলুচ জাতীয়তাবাদীরা এই জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্তি ও ১৯৫৫ সালে কালাত রাজ্য বিলুপ্ত করার ঘটনাকে কখনোই মেনে নেয়নি, যা আজকের সমস্ত সংঘাতের মূল ভিত্তি।
ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক দিক থেকে বেলুচিস্তান অত্যন্ত সমৃদ্ধ কিন্তু রাজনৈতিকভাবে চরম উপেক্ষিত এক জনপদ। প্রায় ৩,৪৭,১৯০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই প্রদেশটি পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৮% দখল করে আছে। বৃহত্তর ইরানীয় মালভূমির পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত এই অঞ্চলের ভূমিরূপ মূলত রুক্ষ ও পাহাড়ি, যেখানে গাছপালার পরিমাণ খুবই কম। আরব সাগরের উপকূলে ৯৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং গ্বাদার বন্দরের মতো কৌশলগত অবস্থান থাকা সত্ত্বেও, খনিজ তেল, গ্যাস, কয়লা, তামা ও সোনা—এই বিশাল সম্পদের অধিকাংশ পাকিস্তান রাষ্ট্র ও সামরিক জান্তা পাচার করেছে পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশের উন্নয়নে। ফলস্বরূপ, এই অঞ্চলের প্রধান জনগোষ্ঠী—বেলুচ ও ব্রাহুইদের পাশাপাশি বসবাসকারী জিকরি ও শিয়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ সাধারণ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর-এর নামে গ্বাদার বন্দরে গড়ে ওঠা যৌথ আধিপত্য স্থানীয়দের মধ্যে এই শঙ্কা জাগিয়েছে যে, তারা নিজ ভূমিতেই পরবাসী হয়ে পড়বে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ বেলুচ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও প্রেরণাদায়ক অধ্যায়। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অংশ হওয়া সত্ত্বেও খান আব্দুল সামাদ খান আচাকযাই, মির গাউস বাক্ষ বিযেঞ্জো এবং সর্দার আতাউল্লাহ মেঙ্গেলের মতো নেতৃবৃন্দ বাঙালিদের ওপর চালানো সামরিক জান্তার গণহত্যার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। সেই সময়ে অনেক বেলুচ সৈন্য বাঙালিদের ওপর নৃশংসতা সইতে না পেরে সেনা ছাউনি থেকে পালিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বেলুচদের মনে এই বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল যে, সামরিক শক্তির জোরে কোনো জাতিকে অনন্তকাল পরাধীন রাখা যায় না। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বাঙালির ওপর চালানো সেই একই অমানবিক দমন-পীড়ন বেলুচিস্তানেও বারবার ফিরে এসেছে। বিশেষ করে ১৯৭৩-৭৭ সাল পর্যন্ত জুলফিকার আলী ভুট্টো ও জেনারেল টিক্কা খানের শাসনামল এবং ২০০৬ সালে প্রবীণ নেতা নবাব আকবর খান বুগতিকে সামরিক হামলায় হত্যার ঘটনা বেলুচদের মনে স্বাধীনতার আগুনকে নতুন করে উস্কে দিয়েছে। গত দুই দশকে কয়েক হাজার বেলুচ ছাত্র, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী রহস্যজনকভাবে ‘গুম’ হয়েছেন এবং এই রাষ্ট্রীয় গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি আজ বিশ্ব মানবাধিকারের এক কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেলুচিস্তানের লড়াই কেবল পাহাড়ি গেরিলাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ছাত্র, নারী ও মধ্যবিত্তের এক গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। বিশিষ্ট আন্দোলনকর্মী মীর ইয়ার বেলুচসহ অনেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের কাছে ‘গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র বেলুচিস্তান’-কে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতীক হিসেবে নিজেদের জাতীয় পতাকা ও মানচিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং ‘মা চুকাইন বালুচানি’ গানটিকে জাতীয় সংগীত হিসেবে এবং ‘বালোচি ফালুস’ নামক নিজস্ব মুদ্রাকে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার চিহ্ন হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বিএলএ (BLA)-এর সশস্ত্র তৎপরতা এবং রাষ্ট্রের ‘অপারেশন শাবান’-এর মতো চিরুনি অভিযানের মুখে দাঁড়িয়ে বেলুচ জাতি তাদের চার হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির যে উত্তরাধিকার বহন করছে, তা যেকোনো কৃত্রিম রাজনৈতিক কাঠামোর চেয়ে প্রাচীন ও শক্তিশালী। পরিশেষে বলা যায়, আজকের বেলুচিস্তান কেবল পাকিস্তানের একটি প্রদেশের নাম নয়, এটি বিশ্বের নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠীর মুক্তির এক নতুন দিগন্ত।
যদি তারা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়, তবে এটি হবে ইতিহাসের অন্যতম বড় মুক্তি আন্দোলন। আর যদি তা নাও হয়, তবুও এ কথা স্পষ্ট যে, পাকিস্তানের সাথে জোরালোভাবে আর কোনো দিন মিশে থাকা এই ভূখণ্ডের পক্ষে সম্ভব নয়। শোষণের ভিত ভেঙে পড়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে এবং কাশ্মীরসহ অন্যান্য নিপীড়িত অঞ্চলগুলো যদি বেলুচিস্তানের এই সাহসিকতা থেকে অনুপ্রেরণা নেয়, তবে পাকিস্তান নামক দেশটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। বেলুচিস্তান দীর্ঘজীবী হোক, বেলুচ জাতি শান্তিতে থাকুক—এটিই আজ বিশ্বের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের কাম্য; পাকিস্তান তার দমনমূলক নীতির অবসান না ঘটালে এই ভূখণ্ডে শান্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ।
