নিজস্ব প্রতিবেদন : নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় চলমান এইচএসসি পরীক্ষায় এক চরম ও নজিরবিহীন গাফিলতির চিত্র সামনে এসেছে। পরীক্ষা শুরুর দীর্ঘ প্রায় এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিট (পৌনে দুই ঘণ্টা) পর কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানতে পারে যে, তারা পরীক্ষার্থীদের হাতে ভুল বছরের প্রশ্নপত্র তুলে দিয়েছে। ২০২৬ সালের চলমান পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের সরবরাহ করা হয়েছিল ২০২৫ সালের পুরোনো প্রশ্নপত্র। এই ঘটনায় কেন্দ্র জুড়ে তীব্র উত্তেজনা ও পরীক্ষার্থীদের মাঝে চরম মানসিক বিপর্যয় নেমে আসে। পরবর্তীতে ভুল প্রশ্নপত্র সংশোধন করে নতুন প্রশ্ন সরবরাহের পর বেলা ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করতে বাধ্য হয় উপজেলা প্রশাসন।
আজ রোববার (১৯ জুলাই) সকাল ১০টায় উপজেলার বড়ভিটা স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ইতিহাস প্রথম পত্রের পরীক্ষায় এই নজিরবিহীন ঘটনাটি ঘটে। কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থীদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, শিক্ষকদের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় বড় ধরণের ক্ষতি হয়ে গেল। সকাল ১০টায় পরীক্ষা শুরুর পর তারা স্বাভাবিকভাবেই খাতায় উত্তর লিখতে শুরু করে। অনেক পরীক্ষার্থী যখন চারটি সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর লেখা শেষ করে ফেলেছেন, অর্থাৎ পরীক্ষার অর্ধেকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, তখন বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে শিক্ষকরা ভুল বুঝতে পারেন। কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে ভুল প্রশ্নপত্রগুলো গুটিয়ে নিয়ে ২০২৬ সালের নতুন প্রশ্নপত্র সরবরাহ করে। তবে নতুন প্রশ্ন দিলেও প্রথমে পরীক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় দিতে কর্তৃপক্ষ গড়িমসি করেছিল বলে অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের। পরবর্তীতে তীব্র প্রতিবাদের মুখে বেলা ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
পরীক্ষার্থী পলক ও হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পরীক্ষা শুরুর পর প্রশ্নের ওপর সাল খেয়াল না করায় আমরা প্রথমে বুঝতে পারিনি। কিন্তু পৌনে দুই ঘণ্টা পর যখন শিক্ষকরা এসে বললেন প্রশ্ন ভুল, তখন আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। শিক্ষকদের এই ক্ষমার অযোগ্য গাফিলতির কারণে আমাদের যে মানসিক ক্ষতি হলো, তা কে পূরণ করবে?” আরেক পরীক্ষার্থী শুভ মিয়া জানান, চারটি সৃজনশীল লেখা শেষ করার পর নতুন প্রশ্ন দেওয়ায় আবার নতুন করে সাতটি সৃজনশীল লিখতে হয়েছে, যা চরম যন্ত্রণাদায়ক ছিল।
এদিকে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার বিষয়ে বড়ভিটা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ বাদশা আলমগীরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা সঠিক প্রশ্ন দিয়েই পরীক্ষা নিয়েছি।” একাধিক শিক্ষার্থীর সুনির্দিষ্ট লিখিত ও মৌখিক অভিযোগের কথা তুলতেই তিনি ‘ব্যস্ত আছেন’ বলে তড়িঘড়ি করে ফোন কেটে দেন এবং পরবর্তীতে নিজের মোবাইল ফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখেন।
কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুর রহমান জানান, বড়ভিটা স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে মোট ৪৯০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে আজ ৪৭৯ জন উপস্থিত ছিলেন। তবে সব কক্ষে ভুল প্রশ্ন যায়নি, নির্দিষ্ট কয়েকটি কক্ষে এই ভুল হয়েছে। এই গুরুতর গাফিলতির ঘটনার নেপথ্যে কার বা কাদের অবহেলা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফুজ্জামান জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ইউএনও মহোদয়ের সাথে জরুরি বৈঠকে বসেছে এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দোষী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
