নিজস্ব প্রতিবেদন : একটি সিআর মামলায় তিন মাসের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে গত ৯ই জুলাই কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে এসেছিলেন মোছা. রিম্পা (২১)। কিন্তু কাশিমপুরের মতো দেশের অন্যতম উচ্চ নিরাপত্তার কারাগার থেকে চোখের পলকে পালাতে এই বন্দি তরুণীর পরিকল্পনায় সময় লেগেছে মাত্র ৮ দিন এবং অত্যন্ত নিখুঁত কৌশলে তিনি তা বাস্তবায়ন করেছেন মাত্র কয়েক মিনিটেই। তাঁর এই অবিশ্বাস্য ও দুঃসাহসিক পলায়নকে ঘিরে পুরো কারা প্রশাসনের ভেতরে চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এই স্পর্শকাতর ঘটনা তদন্তে ইতিমধ্যেই উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ায় তিন জন মেট্রন ও চার জন মহিলা কারারক্ষীসহ মোট সাত জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
কারাগারের নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, গত ১৬ই জুলাই, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রায় বেশ কয়েকজন নারী বন্দিকে দিয়ে কারাগারের ভেতরের আঙিনায় ইট বহনের কাজ করানো হচ্ছিল। ঠিক সেই কাজের ফাঁকে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে এক পর্যায়ে রিম্পা কারাগারের প্রধান অফিস ভবনের পাশের দেয়ালের কার্নিশ বেয়ে ডানা কাটা পাখির মতো সীমানা প্রাচীর টপকে বাইরে পালিয়ে যান। উচ্চ নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে চম্পট দিতে তাঁর সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। পলাতক রিম্পা মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার রায়পুর গ্রামের হাসানের মেয়ে, যিনি ঢাকার কারওয়ান বাজার এলাকায় বসবাস করতেন। ঢাকার ধানমন্ডি থানার একটি সিআর মামলায় তিন মাসের সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর গত ৯ই জুলাই বিজ্ঞ আদালত তাঁকে এই কারাগারে পাঠিয়েছিলেন।
পলায়ন ঘটনার পরপরই কারা কর্তৃপক্ষ গভীর আশঙ্কায় পুরো কারাগার জুড়ে চিরুনি তল্লাশি চালালেও রিম্পার কোনও সন্ধান পায়নি। পরবর্তীতে কারাগারের ভেতরে ও বাইরে থাকা সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিশ্চিত হন যে, তিনি সুকৌশলে সীমানা প্রাচীর ডিঙিয়ে কারাগার থেকে পালিয়ে গেছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় দায়িত্ব অবহেলার দায়ে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত হওয়া সাত জন হলেন— মেট্রন লায়লা আনজুমান সুমি, মেরিনা ও রেহেনা এবং চার নারী কারারক্ষী শায়লা, শারমিন, জেমি ও আসমা।
এই বিষয়ে এআইজি প্রিজন্স জান্নাতুল ফরহাদ গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনার পর পরই কোনাবাড়ি থানায় বিধি মোতাবেক মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং পলাতক বন্দিকে দ্রুত গ্রেপ্তারে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একযোগে মাঠে কাজ করছে। দেশের এতো নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যেও একজন বন্দি কারাগার থেকে কিভাবে এভাবে উধাও হয়ে গেল, তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর থেকে বন্দি রিম্পাকে আর কারাগারে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে আমাদের বিশেষ টিম কাজ করতে গিয়ে ইতিমধ্যেই একটি শক্তিশালী ‘ক্লু’ বা সূত্র পেয়েছে। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর কোনাবাড়ি এলাকার অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মোবাইল ফোন থেকে ওই তরুণী তাঁর মেহেরপুরের বাড়িতে কথা বলেছেন। বর্তমানে সেই মোবাইল সূত্র ধরে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে। এআইজি প্রিজন্স আরও উল্লেখ করেন যে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বিকাল ৫টার মধ্যে সকল বন্দিদের সেলে লকআপ করতে হয়। কিন্তু সেদিন ওই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বন্দিদের লকআপ না করে বাইরে কাজ করানোর সুযোগেই এই বন্দি কৌশলে কারাগার থেকে পালিয়ে যান।
এদিকে, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি)-র কোনাবাড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইফতেখার হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, শুক্রবার কারাগারের জেলার শিরীন আক্তার বাদী হয়ে মহিলা কারাগার থেকে এক বন্দি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও মামলা করেছেন। দেশের উচ্চ নিরাপত্তা বলয় ফাঁকি দেওয়া ওই পালিয়ে যাওয়া বন্দিকে পুনরায় গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম অত্যন্ত তৎপরতার সাথে বিশেষ অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেছে।
