লেখকঃ হুমায়ূন কবীর ঢালী
মেহের আফরোজ শাওন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল, বহুমাত্রিক ও কালজয়ী নক্ষত্র। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে আজ অব্দি এ দেশের শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতিটি শাখায় তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন অত্যন্ত সগৌরবে। তিনি একাধারে যেমন একজন প্রখ্যাত ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী, তেমনি এক সুকণ্ঠী গায়িকা, সফল চলচ্চিত্র নির্মাতা, সুনিপুণ স্থপতি এবং সংবেদনশীল লেখক। গুণের এই চমৎকার ও বিরল সমন্বয় তাঁকে সমসাময়িক অন্যান্য তারকাদের চেয়ে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কোনো একক পরিচয়ে তাঁকে বেঁধে রাখা অসম্ভব, বরং সংস্কৃতির ক্যানভাসে তিনি এক বর্ণিল ও স্বকীয় নাম, যিনি নিজের মেধা আর মননশীলতার জোরে প্রতিটি মাধ্যমেই তৈরি করেছেন একটি স্বতন্ত্র পাঠক ও দর্শকশ্রেণি।
তাঁর এই অনন্য পথচলার ভিত্তিপ্রস্তরটি রচিত হয়েছিল এক সুসংস্কৃত ও শৈল্পিক পারিবারিক আবহে। ১৯৭৯ সালের ১২ অক্টোবর ঢাকায় এক সম্ভ্রান্ত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন পরিবারে মেহের আফরোজ শাওনের জন্ম হয়। তাঁর বাবা প্রকৌশলী আলী রেজা এবং মা তহুরা আলী, যিনি একজন সাবেক সংসদ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত সুপরিচিত এক ব্যক্তিত্ব। মায়ের গভীর সাংস্কৃতিক অনুরাগের সুবাদেই খুব ছোটবেলা থেকে শাওন নাচ, গান ও অভিনয়ের মতো শিল্পকলার নান্দনিক মাধ্যমগুলোর সাথে যুক্ত হওয়ার এক চমৎকার সুযোগ ও পরিবেশ লাভ করেন। শৈশবে তিনি যেমন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, তেমনই ছিলেন প্রখর চঞ্চল প্রকৃতির। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরুটা হয় মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে, যেখান থেকে তিনি অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। শৈশবের সেই পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁর ভেতরের সুপ্ত শৈল্পিক প্রতিভাকে প্রথম বড় পরিসরে সবার সামনে নিয়ে আসে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় জাতীয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতা ‘নতুন কুঁড়ি’। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি চামচ-নৃত্য এবং অভিনয়ে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার অর্জন করেন, যা তাঁর আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
শাওনের শিশুবেলার সবচেয়ে বড় এবং জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনাটি ঘটেছিল নব্বইয়ের দশকের একেবারে শুরুতে। তখন তিনি বিটিভির একটি নাটকের জন্য অডিশন দিতে যান এবং সেখানে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের জহুরি চোখে ধরা পড়েন। চটপটে স্বভাব ও ছোটখাটো গড়নের এই তীক্ষ্ণ ধীসম্পন্ন মেয়েটিকে দেখে হুমায়ূন আহমেদ ভীষণ পছন্দ করেন এবং তাঁর পরিচালিত ‘জননী’ নাটকের একটি ছোট্ট চরিত্রের মাধ্যমে শাওনকে কাস্ট করেন। এই ‘জননী’ নাটক দিয়েই মূলত মেহের আফরোজ শাওনের পেশাদার অভিনয় জীবনের এক সোনালী অধ্যায়ের পথচলা শুরু হয়, যা পরবর্তীতে তাঁকে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ ও কালজয়ী তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। শৈশবের সেই অপার চঞ্চলতা এবং সংস্কৃতির প্রতি গভীর আত্মিক টানই তাঁকে পরবর্তী জীবনে একাধারে একজন দক্ষ স্থপতি, কালজয়ী অভিনেত্রী, জনপ্রিয় গায়িকা ও সফল নির্মাতা হিসেবে সার্থকভাবে গড়ে তুলতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
‘জননী’ নাটকের মাধ্যমে ক্যামেরার সামনে প্রথম দাঁড়ালেও দেশজুড়ে কোটি দর্শকের হৃদয়ে তিনি চিরস্থায়ী আসন লাভ করেন নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে জাদুকরী নাটক ‘আজ রবিবার’-এর মাধ্যমে। এই নাটকে চঞ্চল, ভীষণ জেদি অথচ প্রচণ্ড মায়াবী ও প্রাণবন্ত ‘তিতলি’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় নবীন-প্রবীণ সব বয়সী মানুষকে গভীরভাবে আচ্ছন্ন করেছিল। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। হুমায়ূন আহমেদের কালজয়ী ধারাবাহিক নাটক ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’ কিংবা ‘সবুজ সাথী’র মতো বহু একক ও ধারাবাহিক নাটকে তাঁর সাবলীল ও মনকাড়া অভিনয় দেশের নাট্যজগতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। নাটকের এই গণ্ডি পেরিয়ে একসময় তিনি পা রাখেন রূপালী পর্দায় এবং সিনেমাতেও নিজের মেধার চরম বিকাশ ঘটান। অভিনেত্রী হিসেবে শাওন যে কটি চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন, তার প্রায় প্রতিটিই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একেকটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে আজ অব্দি দেদীপ্যমান। ১৯৯৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’-এ গ্রামীণ তরুণী ‘কুসুম’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় সর্বমহলে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়। জমিদার বাড়ির এক তরুণের সুপ্ত ভালোবাসা আর গ্রামীণ লোকগায়ক মতির প্রতি অন্তরের টান—এই দুইয়ের দোলাচলে পিষ্ট হওয়া এক সাধারণ অথচ গভীর আবেগী গ্রামীণ তরুণীর রূপ তিনি পর্দায় অসামান্য দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এরপর ২০০০ সালে মুক্তি পায় তাঁর আরেকটি দর্শকপ্রিয় ছবি ‘দুই দুয়ারী’, যেখানে রিয়াজ ও মাহফুজ আহমেদের বিপরীতে এক চটপটে শহুরে তরুণীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও সাবলীল। ২০০৩ সালে ব্রিটিশ আমলের এক অত্যাচারী জমিদারের গল্প নিয়ে তৈরি ‘চন্দ্রকথা’ চলচ্চিত্রে প্রধান নারী চরিত্র ‘চন্দ্রা’ হিসেবে শাওন অনবদ্য ও স্মরণীয় অভিনয় উপহার দেন। আর ২০০৮ সালে নির্মিত ‘আমার আছে জল’ ছিল হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত শেষ চলচ্চিত্র, যেখানে শাওন ‘নিশাদ’ নামের এক জটিল ও গাম্ভীর্যপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। দুই বোনের সূক্ষ্ম মানসিক টানাপোড়েন ও গভীর আবেগের গল্প নিয়ে তৈরি এই ছবিতে তাঁর পরিপক্ব ও সংযত অভিনয় সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে বোদ্ধা মহলের উচ্চসিত প্রশংসা কুড়ায়।
কেবল রূপালী পর্দায় অভিনয়ের জাদুই নয়, মেহের আফরোজ শাওনের কণ্ঠের মায়াবী জাদুতেও দীর্ঘকাল ধরে আবিষ্ট হয়ে আছে এ দেশের আপামর শ্রোতাকুল। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্র এবং নাটকে গাওয়া তাঁর লোকগান ও মরমী গানগুলো শ্রোতাদের হৃদয়ে একদম আলাদা এবং চিরস্থায়ী একটা জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর কণ্ঠের এক অদ্ভুত করুণ ও মায়াবী সুর মরমী ও বিরহের গানগুলোকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া ‘চাঁদনী পসরে কে আমারে স্মরণ করে’, ‘পূবালী বাতাসে’ কিংবা ‘আমার ভাঙা ঘরে’র মতো কালজয়ী গানগুলো আজ মানুষের মুখে মুখে ফেরে। সংগীতের এই অসাধারণ প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৬ সালে তাঁর নিজের পরিচালিত ‘কৃষ্ণপক্ষ’ চলচ্চিত্রে ‘যদি মন কাঁদে’ গানটির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে সম্মানজনক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংগীত প্ল্যাটফর্ম ‘কোক স্টুডিও বাংলা’-তে তাঁর গাওয়া ‘যুবতী রাঁধে’ লোকগানটি নতুন ধারার সংগীতায়োজনে তরুণ প্রজন্মের মাঝে এক অভাবনীয় আলোড়ন ও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
শিল্পের এতসব ভুবনে বিচরণ করার পাশাপাশি মেহের আফরোজ শাওন পড়াশোনাতেও ছিলেন সমান উজ্জ্বল। তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় (Architecture) অত্যন্ত সফলতার সাথে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এই প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও প্রখর মননশীলতা তাঁকে কেবল ক্যামেরার সামনেই নয়, ক্যামেরার পেছনের জগতেও সমান সফল করে তুলেছে। বেশ কিছু একক ও ধারাবাহিক নাটক অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালনার পর ২০১৬ সালে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে তিনি নির্মাণ করেন তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘কৃষ্ণপক্ষ’। রিয়াজ ও মাহী অভিনীত এই সিনেমাটি পরিচালনা করে তিনি একজন দূরদর্শী ও কুশলী চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ২০০৫ সালে তিনি প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তাঁদের দাম্পত্য জীবনকে আলো করে সংসারে আসে নিষাদ হুমায়ূন ও নিনিত হুমায়ূন নামে দুটি পুত্রসন্তান। ২০১২ সালে এই মহান স্রষ্টা ও প্রিয় মানুষের আকস্মিক প্রয়াণের পর এক গভীর শূন্যতা নেমে এলেও শাওন নিজেকে শক্ত হাতে সামলে নিয়েছেন। তখন থেকে আজ অব্দি হুমায়ূন আহমেদের সুবিশাল সৃষ্টিসমগ্র, তাঁর অপ্রকাশিত লেখা, তাঁর স্মৃতিধন্য নুহাশ পল্লীর সবুজ প্রকৃতি এবং তাঁর আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে অবিকৃতভাবে বাঁচিয়ে রাখার এক পরম গুরুদায়িত্ব তিনি অত্যন্ত যত্ন, নিষ্ঠা ও ভালোবাসার সাথে কাঁধে তুলে নিয়েছেন।
শিল্পের এই বিশাল ক্যানভাসে একজন লেখক হিসেবেও মেহের আফরোজ শাওন নিজের একটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেছেন। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণের পর নিজের ভেতরের একাকীত্ব, গভীর অনুভূতির কথা এবং জীবনের যাপিত বিচিত্র সব অভিজ্ঞতাকে তিনি চমৎকার, সাবলীল ও হৃদয়স্পর্শী গদ্যে বইয়ের পাতায় রূপ দিয়েছেন। অমর একুশে বইমেলায় তাঁর লেখা বইগুলো প্রতি বছর পাঠকদের মাঝে বেশ সাড়া ফেলে। লেখক হিসেবে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে কিছু কথা’। এই বইটি মূলত হুমায়ূন আহমেদের সাথে তাঁর কাটানো আনন্দ-বেদনার দিনগুলো, এক ছাদের নিচে বসবাসের অন্তরঙ্গ অভিজ্ঞতা এবং একজন সাধারণ মানুষ ও অসাধারণ স্রষ্টা হিসেবে হুমায়ূন আহমেদকে খুব কাছ থেকে দেখার এক পরম স্মৃতিকথা, যেখানে তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোর এক পরম আবেগঘন ও বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। তাঁর আরেকটি প্রশংসিত বই ‘নহাশ পল্লীর দিনগুলি’ গড়ে উঠেছে হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের বাগানবাড়ি ‘নুহাশ পল্লী’কে কেন্দ্র করে, যেখানে প্রকৃতির সাথে তাঁদের মিতালী, বৃষ্টির দিনে আনন্দ উদযাপন এবং হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিশীলতার পেছনের অজানা গল্পগুলো শাওন অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় লিখেছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক ও ম্যাগাজিনে তিনি নিয়মিত কলাম ও ভ্রমণকাহিনী লিখেছেন। শাওনের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ও বৈশিষ্ট্য হলো এর অকৃত্রিম সরলতা। কোনো ধরনের কৃত্রিম অলঙ্কার বা বাহুল্য ছাড়াই নিজের ভেতরের গভীরতম অনুভূতি ও ফেলে আসা স্মৃতিগুলোকে তিনি যেভাবে সহজ ও সাবলীল বাংলায় রূপ দেন, তা একজন সংবেদনশীল ও উঁচুমাপের লেখক হিসেবে তাঁর মনের পরিচয় বহন করে। হুমায়ূন আহমেদের কোটি ভক্তের কাছে হুমায়ূন-পরবর্তী সময়ে প্রিয় লেখকের ব্যক্তিজীবন ও সৃষ্টি সম্পর্কে জানার জন্য শাওনের এই বইগুলো এক একটি অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল।
অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ— এই তিন সত্যে অন্তপ্রাণ মেহের আফরোজ শাওন অভিনয়, সংগীত, পরিচালনা, স্থাপত্যশিল্প এবং সাহিত্য—সব মাধ্যমেই এক অনন্য সফল ব্যক্তিত্ব, যিনি নিজের মেধা ও কর্মের আলোয় এ দেশের সংস্কৃতির আকাশকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করে চলেছেন।
