ড. মাসুদার রহমান, অধ্যাপক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশ একসময় বৈশ্বিক পরিসরে “ভ্যাকসিন হিরো” হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিল। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে দেশটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করলেও আজ এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি। হাম সংক্রমণ বৃদ্ধি, শিশুমৃত্যুর খবর এবং টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা—সব মিলিয়ে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। প্রশ্নটি শুধু স্বাস্থ্যখাতের নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার, নেতৃত্ব এবং বাস্তবতার প্রতিফলন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হাম সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন হাসপাতাল শিশু রোগীতে ভরে উঠছে, আর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে—সম্প্রতি হামে আক্রান্ত হয়ে ৫০-এর অধিক শিশুর মৃত্যু ইতোমধ্যেই ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সাম্প্রতিক সময়ে টিকাদানের দুর্বলতা, কর্মসূচির বিলম্ব এবং ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ।
এই বাস্তবতার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফটোকার্ডগুলো পরিস্থিতিকে আরও তীব্র ভাষায় তুলে ধরছে। কোথাও বলা হচ্ছে—“ভ্যাকসিন হিরোর দেশে টিকার হাহাকার”, কোথাও দাবি করা হচ্ছে টিকার অভাবে শিশুমৃত্যু বাড়ছে, আবার কোথাও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সরাসরি ব্যর্থ বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। কিছু কার্ডে নেতৃত্বের প্রতি তীব্র সমালোচনা করে বলা হয়েছে—যারা বিশ্বে মানবতার কথা বলেন, তারা নিজ দেশের শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলে নিখুঁত মুখোশ পরে বিদেশে শিশুদের সঙ্গে ফটোসেশন করছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ড. ইউনুসকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক ঘনীভূত হয়েছে। তাঁর সময়কালে টিকাদানের হার নেমে প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে—এমন দাবি বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে। ড. ইউনুসের সময় ভ্যাকসিন ক্রয়ে বিলম্ব এবং টিকাদানের ঘাটতির কারণেই বর্তমানে হাম প্রাদুর্ভাব বেড়েছে এবং ৫০-এর অধিক কোমলমতি শিশুর প্রাণ ঝরে পড়েছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার নতুন কর্মসূচি অনুমোদিত না হওয়ায় একটি নীতিগত শূন্যতা তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচির পরিবর্তে দুই বছর মেয়াদি একটি ডিপিপি গ্রহণ করে, যেখানে প্রথম বছরের জন্য ১,৪৫১ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও তা সময়মতো ছাড় হয়নি। ফলে টিকা ক্রয়ে সরাসরি সংকট দেখা দেয়। যার ফলে এ সময় শিশুরা তাদের নিয়মিত হামের টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। হাম প্রতিরোধক্ষমতার শূন্যতার কারণে শিশুদের মধ্যে এটির প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ।
বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে, যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নয়, বরং আগের মতো টেকসই পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
বাংলাদেশ আজ এক দ্বৈত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে—একদিকে অতীতের সাফল্য, অন্যদিকে ইউনুস সরকারের দুর্বলতা। “ভ্যাকসিন হিরোর দেশে টিকার হাহাকার”—এটি শুধু একটি স্লোগান নয়; বরং একটি সতর্কবার্তা। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়—এই সংকটকে কি সাময়িক বিচ্যুতি হিসেবে দেখা হবে, নাকি এটি বড় কোনো ব্যবস্থাগত সমস্যার পূর্বাভাস?
কারণ শেষ পর্যন্ত, উন্নয়নের আসল মানদণ্ড নির্ধারিত হয় একটি প্রশ্নে—রাষ্ট্র কি তার শিশুদের সুরক্ষা দিতে পারছে?
