গতকালের লেখা পর্যন্ত আমি উপলব্ধি করতে পারিনি বিপর্যয়টি কী মারাত্মক পর্যায়ের। গত কয়েকঘন্টা এ নিয়ে পড়েছি, বিশেষজ্ঞ কয়েকজনের মতামত জেনেছি। তারপর আমার মেরুদন্ড বেয়ে আতংকের একটা শীতল স্রোত বয়ে গেছে। এটি যদি পরিকল্পিত নাও হয়, যদি অবহেলাজনিতও হয় তবু এটি আয়োজিত শিশু হত্যা। এর এফেক্ট ও আফটার এফেক্ট দীর্ঘ।
শান্তিতে নোবেল পাওয়া যে লোকটাকে পশ্চিমারা দেবদূত হিসেবে সাজিয়েছিলো এবং বাংলাদেশের বহু মানুষ বিশ্বাস করেছিলো, সেই লোকটিকে কেনো এই ভয়ংকর পরিস্থিতির জন্য দায়ী করা হবে না? এরপর তার পক্ষে কারো কাছে কোন যুক্তি আছে?
বাংলাদেশে শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম মূল ভিত্তি হলো সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI- Expanded Programme on Immunization)। ১৯৭৯ সাল থেকে চালু এই কর্মসূচি দশকের পর দশক ধরে লক্ষ লক্ষ শিশুকে হাম, পোলিও, ডিপথেরিয়া, যক্ষ্মা সহ প্রাণঘাতী রোগ থেকে রক্ষা করে আসছে। কিন্তু ২০২৪-২০২৫ সালে এই কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন ঘটেছে এবং তার পরিণতি এখন দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে ভয়াবহভাবে।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার পঞ্চম সেক্টর কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে EPI ভ্যাকসিন সংগ্রহ বন্ধ হয়ে যায়, যা ২০২৫ সালে তীব্র ভ্যাকসিন সংকট সৃষ্টি করে। ২০২৪ সালে নির্ধারিত একটি বিশেষ টিকাদান অভিযান বাস্তবায়িত হয়নি, এবং গত বছর স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলন ও পরিচালনগত সমস্যার কারণে নিয়মিত টিকাদান সেবা বারবার ব্যাহত হয়েছে।
২০২৪ সালের জুনে নির্ধারিত হামের বিশেষ টিকাদান অভিযান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে স্থগিত হয়ে যায়। এর বাইরে, UNICEF ও Gavi-র সহায়তায় পরিচালিত কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিক সরবরাহ এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রম সবই ব্যাহত হয়। শহরের বস্তি এলাকা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রবেশযোগ্যতার সমস্যাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
টিকাদান হ্রাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হলো ২০২৬ সালে হামের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব। চলতি বছর এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩৮ জন শিশু হাম বা এর জটিলতায় মারা গেছে, যার মধ্যে মার্চ মাসেই মারা গেছে ৩২ জন। অসম্পূর্ণ রিপোর্টিংয়ের কারণে প্রকৃত সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ সারা দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা ইতিমধ্যে ১,৫০০ ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই নয় মাসের কম বয়সী শিশু, যারা এখনো টিকা পাওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি। এর অর্থ হলো, কমিউনিটির মধ্যে ভাইরাস এত বেশি ছড়িয়ে পড়েছে যে সুরক্ষাযোগ্য শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে।
টিকাদান কর্মসূচিতে হ্রাসের প্রভাব কেবল হামেই সীমাবদ্ধ নয়। যে শিশুরা পেন্টাভ্যালেন্ট, পিসিভি, রোটাভাইরাস, পোলিও ও রুবেলার টিকা মিস করেছে, তারা আগামী কয়েক বছরে এই রোগগুলোর ঝুঁকিতে থাকবে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ শিশু আংশিকভাবে টিকা পেয়েছে এবং ৭০,০০০ শিশু একটি টিকাও পায়নি -এরাই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে প্রতিরোধযোগ্য শিশু মৃত্যুর বড় অংশের কারণ।
ব্যাপক শিশু অপুষ্টির সাথে মিলিত হয়ে এবং ঘন জনসংখ্যার কারণে রোগ সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে হামের জটিলতা যেমন নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস এবং মৃত্যু অনেক বেশি।
বাংলাদেশের EPI কর্মসূচি প্রতি বছর প্রায় ৯৪,০০০ জীবন বাঁচায় এবং ৫০ লাখ শিশুর অসুস্থতা প্রতিরোধ করে- বিনিয়োগের প্রতি ডলারে ২৫ ডলারের সুবিধা প্রদান করে। Gavi এই কর্মসূচি ব্যাহত হওয়া মানে শুধু স্বাস্থ্য ক্ষতি নয়, বরং বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতিও। হাসপাতালে ভর্তি, চিকিৎসা ব্যয়, এবং পরিবারের কাজ হারানো- এসব মিলিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
২০২৪-২৫ সালের টিকাদান কর্মসূচিতে হ্রাস বাংলাদেশের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা। দশকের পর দশক ধরে গড়ে তোলা শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষার ভিত্তি এই কারনে ভেঙে পড়তে পারে।
