নিজস্ব প্রতিনিধি
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকাদান কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চরমে পৌঁছেছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন যে, গত ৮ বছর ধরে দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। তবে, সরকারের নিজস্ব টিকাদান কর্মসূচির ড্যাশবোর্ড এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ এর তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে এই দাবির সাথে বাস্তবতার কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের Expanded Programme on Immunization (EPI) এবং WHO-UNICEF-এর যৌথ WUENIC (WHO/UNICEF Estimates of National Immunization Coverage) রিপোর্ট অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে হাম (MR) টিকার কভারেজ ছিল অত্যন্ত সন্তোষজনক। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৯৭ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৯৭ শতাংশ, ২০২০ সালে ৯৭ শতাংশ, ২০২১ সালে ৯৭ শতাংশ, ২০২২ সালে ৯৬ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৯৬ শতাংশ ও ২০২৪ সালে ৯৬ শতাংশ।
এই তথ্য স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করে যে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে টিকাদানের হার ৯০ শতাংশ এর উপরে, এমনকি শতাংশ পর্যন্ত ছিল। সুতরাং, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর “৮ বছর টিকা দেওয়া হয়নি” — এই বক্তব্য একেবারেই উপাত্ত-বিরুদ্ধ।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে সরকারি EPI ড্যাশবোর্ডে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে টিকাদানের হার হঠাৎ করে ৬০%-এর নিচে নেমে এসেছে। একই সাথে, যক্ষ্মা (BCG) টিকার যারা প্রথম ডোজ বা প্রধান টিকাগুলো পায়নি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩.২শতাংশ। যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। জনস্বাস্থ্যে “Herd Immunity” বজায় রাখতে হলে সাধারণত ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি জনসংখ্যাকে টিকার আওতায় রাখা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, টিকার কভারেজ যদি ৭০ শতাংশ-এর নিচে নেমে যায়, তবে হামের মতো রোগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব হওয়া একেবারেই স্বাভাবিক। বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা এই তথ্যের আলোকেই বিচার করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার যতদিন ক্ষমতায় ছিলো সেই সময় পর্যন্ত টিকাদানের হার ধারাবাহিকভাবে উচ্চ ছিল।
তাই বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন দাবি করেন যে গত ৮ বছর টিকা দেওয়া হয়নি। তখন প্রশ্ন জাগে, এই তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? তার নিজের মন্ত্রণালয়ের ডাটাশিট এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃত তথ্য তো ভিন্ন কথা বলছে।
উত্থাপিত মূল প্রশ্নগুলো এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত যখন টিকাদানের হার ৯০ শতাংশ বা তার বেশি ছিল, তখন “৮ বছর টিকা হয়নি” — এই দাবি কিসের ভিত্তিতে করা হলো? ২০২৫ সালে এসে টিকাদানের হার হঠাৎ করে কেন এত নিচে নেমে গেল? এই মারাত্মক পতনের পেছনে প্রশাসনিক ব্যর্থতা কার?
রাজনীতিবিদরা একে অপরের উপর দায় চাপালেও, ডাটা বলছে যে টিকাদান কর্মসূচিতে একটি বড় রকমের ছেদ পড়েছে এবং তা ২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে। এই ব্যর্থতার দায় বর্তমান প্রশাসন বা সদ্য বিগত ইউনূস সরকার নেবে নাকি পরবর্তী কোনো সরকার, তা নিয়ে বিতর্ক চলমান থাকলেও, জনস্বাস্থ্যের এই ঝুঁকি ডাটার ভিত্তিতেই বিচার করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
এখন সময় এসেছে রাজনীতি না করে ডাটার জবাব ডাটা দিয়েই দেওয়া এবং শিশুদের জীবন সুরক্ষিত করতে টিকাদান কর্মসূচি পুনরায় সচল করা।
