নিজস্ব প্রতিনিধি
দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দ্বিগুণের বেশি দামে তিন কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা নতুন একটি চুক্তিকে দেশের স্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবি উঠেছে। সমালোচকদের মতে, এই দুটি সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতি, রাজস্ব, তথ্য সুরক্ষা এবং দেশীয় প্রযুক্তি খাতকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে তিন কার্গো এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে দুই কার্গো এবং যুক্তরাজ্য থেকে এক কার্গো এলএনজি আনা হবে। তিন কার্গো এলএনজি আমদানিতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬৫৪ কোটি ৫৪ লাখ ৬৩ হাজার ২৮০ টাকা।
বুধবার (১১ মার্চ) সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির আহ্বায়ক অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত এজেন্ডার বাইরে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে ৩ কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫’-এর বিধি-১০৫(৩)(ক) অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক কোটেশন সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় স্পট মার্কেট থেকে এই এলএনজি আনা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ৫-৬ এপ্রিল একটি কার্গো, ৯-১০ এপ্রিল আরেকটি এবং ১২-১৩ এপ্রিল আরও একটি কার্গো এলএনজি দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
তিন কার্গোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের ‘টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড’ থেকে একটি কার্গো এলএনজি আমদানি করা হবে ৯০৭ কোটি ৮৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩০৪ টাকায়। এতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির মূল্য ধরা হয়েছে ২১ দশমিক ৫৮ ডলার। অথচ গত বছরের ৯ ডিসেম্বর একই প্রতিষ্ঠান থেকে এক কার্গো এলএনজি কেনা হয়েছিল ৪৩৬ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫২ টাকায়, তখন প্রতি এমএমবিটিইউ’র দাম ছিল ১০ দশমিক ৩৭ ডলার। অর্থাৎ আগের তুলনায় এবার প্রায় দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনছে সরকার।
একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘পসকো ইন্টারন্যাশনাল কর্পোরেশন’ থেকেও দুই কার্গো এলএনজি আমদানি করা হবে। প্রতিটি কার্গোর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৭৩ কোটি ৩৪ লাখ ৯৯ হাজার ৪৮৮ টাকা। প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ধরা হয়েছে ২০ দশমিক ৭৬ ডলার। অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়া থেকেও এলএনজি আমদানিতে আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে সরকারকে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা নতুন একটি চুক্তি নিয়েও সমালোচনা দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের দাবি, এই চুক্তিটি বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ছয় কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করবে। বর্তমানে গুগল, মাইক্রোসফট ও মেটার মতো বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি বাংলাদেশে ব্যবসা করে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করলেও তারা কার্যত কোনো কর দেয় না। অথচ নতুন চুক্তির ফলে ভবিষ্যতে এসব কোম্পানির কাছ থেকে আলাদা করে কর আদায়ের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
সমালোচকদের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির কারণে বাংলাদেশি কোম্পানি ও মার্কিন কোম্পানির কর কাঠামো সমান রাখতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশি কোম্পানি পাঠাওকে যে পরিমাণ কর দিতে হয়, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোনো অনলাইন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকেও একই পরিমাণ কর দিতে হবে। আবার বাংলাদেশ যদি ফেসবুক, মেটা বা গুগলের মতো প্ল্যাটফর্মের ওপর বেশি কর আরোপ করতে চায়, তাও করা সম্ভব হবে না। এতে সরকারের বছরে প্রায় তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
আরও অভিযোগ করা হচ্ছে, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ছয় কোটি মানুষের তথ্য মার্কিন সরকারের বিশ্বস্ত নেটওয়ার্কে স্থানান্তরিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর ফলে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের মালিকানা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিতে পারে এবং নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকারও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চুক্তির আরেকটি সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে এসেছে। অনেকের মতে, নেটফ্লিক্সের মতো প্ল্যাটফর্মের সাবস্ক্রিপশন নিতে মাসে প্রায় দেড় হাজার টাকা খরচ হয়। একইভাবে একটি বই কিনতেও অনেক সময় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ অনলাইনে পিডিএফ শেয়ার করে বই পড়া বা পাইরেটেড কনটেন্ট দেখার ওপর নির্ভর করেন। নতুন চুক্তির ফলে এসব কার্যক্রম কঠোরভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং পাইরেসির অভিযোগে ফৌজদারি শাস্তির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
সমালোচকদের দাবি, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে মার্কিন বৌদ্ধিক সম্পত্তি (আইপি) সুরক্ষার দায়িত্বও পালন করতে হবে। একই সঙ্গে সরকার বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোকে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা বা প্রণোদনা দেয়, সেগুলো মার্কিন কোম্পানিগুলোকেও দিতে হবে। ফলে দেশীয় প্রযুক্তি বা ট্যাক্সি-অ্যাপ শিল্পকে আলাদা করে ভর্তুকি বা সুরক্ষা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে ভবিষ্যতে বিকাশ, পাঠাও বা এ ধরনের দেশীয় উদ্যোগ গড়ে ওঠাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে দেশের স্বার্থ রক্ষায় নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আহ্বানকারীরা বলেন, বাংলাদেশের মানুষ অতীতে কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের অধিকার নিজেরাই আদায় করেছে হোক তা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ২৪ শের আন্দোলন।
এই প্রেক্ষাপটে দেশবিরোধী বলে অভিযোগ করা মার্কিন চুক্তি বাতিলের দাবিতে আগামী শুক্রবার (১৩ মার্চ) বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ আহ্বান জানিয়েছেন নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের সেন্ট্রাল কাউন্সিল সদস্য মো. মুশফিকুর রহমান। তিনি দেশপ্রেমিক নাগরিকদের নিজস্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় উক্ত কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
