নিজস্ব প্রতিনিধি
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় যখন সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন, তখন জাতীয় সংসদে গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে সরকারি ও বিরোধী পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি দাবি করেছেন যে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে পেট্রোবাংলার তথ্য ও বিগত ১৫ বছরের পরিসংখ্যান এই দাবির বিপরীতে এক ভিন্ন চিত্র উপস্থাপন করছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার মোট ১৫৫টি কূপ খনন করেছে। এই সময়ে দেশে সুন্দলপুর, শ্রীকাইল, রূপগঞ্জ, ভোলা নর্থ, জাকিগঞ্জ এবং ইলিশা—এই ৬টি নতুন ও সমৃদ্ধ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। ২০০৯ সালে যেখানে গ্যাস উৎপাদন ছিল ১৭৪৪ এমএমসিএফডি, তা কোভিডপূর্ব সময়ে বেড়ে প্রায় ২৭৫০ এমএমসিএফডি-তে উন্নীত হয়েছিল।
২০০৯ সালে দেশে একটি রিগও সচল ছিল না। পরবর্তী সময়ে একটি পুরাতন রিগ সংস্কার এবং ৪টি নতুন অত্যাধুনিক রিগ সংগ্রহের মাধ্যমে অনুসন্ধান কার্যক্রম গতিশীল করা হয়। এছাড়া ৩১ হাজার ২৮১ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (2D) এবং প্রায় ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার ত্রিমাত্রিক (3D) সিসমিক জরিপ চালানো হয়। গভীর ও অগভীর সমুদ্রেও ১২ হাজার ৬৪২ লাইন কিলোমিটার সার্ভে সম্পন্ন হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৫০টি কূপ খননের একটি মেগা প্রকল্প চলমান ছিল, যা থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৬১৮ এমএমসিএফডি গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল। ২০২৮ সালের মধ্যে আরও ১০০টি কূপ খননের মাধ্যমে ৯৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল তৎকালীন পেট্রোবাংলা। তবে অভিযোগ উঠেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গতি কমিয়ে দেওয়া বা অনেক ক্ষেত্রে বাতিল করা হয়েছে।
সংসদে দাঁড়িয়ে গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে মন্ত্রীর নেতিবাচক মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে তার নিজের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। উল্লেখ্য, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ২০০১-০৬ মেয়াদে একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন ‘নাইকো দুর্নীতি’ ইস্যুটি বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সালিশী আদালতের রায়েও সেই সময়কার চুক্তিতে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা দেশের এক বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
গ্যাস অনুসন্ধানের মতো একটি প্রযুক্তিগত ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ায় বিগত সরকারের বিশাল কর্মযজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও কেন সংসদে ভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করা হলো, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এটি কি কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক নাকি সচেতন তথ্য বিকৃতি—সেই প্রশ্ন এখন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ জনগণের সামনে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংকটের সময়ে একে অপরের ওপর দোষ না চাপিয়ে চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করাই হবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র পথ।
