অর্থনৈতিক প্রতিবেদক: বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এলপিজি (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) আমদানি সংক্রান্ত একটি সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক চুক্তিকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে গুরুতর দাবি করা হচ্ছে যে, এই অসম চুক্তির ফলে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত অর্থ অপচয় বা ব্যয় করতে হচ্ছে।
হিসাব অনুযায়ী, এই ধারা অব্যাহত থাকলে বছরে সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৮ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে এই বিশাল অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয়ের খবরটি সামনে আসার পর সরকারের চুক্তি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
জ্বালানি খাতের সমালোচক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বছরে ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত ব্যয়ের এই পরিমাণ দেশের যেকোনো বড় অবকাঠামোগত মেগা প্রকল্পের (যেমন মেট্রোরেল বা যমুনা সেতু) মোট ব্যয়ের সঙ্গে তুলনীয়। তাঁদের দাবি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে যেকোনো আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তির সময় জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাবকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল। মার্কিন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তড়িঘড়ি করে এমন ব্যয়বহুল চুক্তি করার পেছনে কোনো বিশেষ মহলের স্বার্থ কাজ করেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
অন্যদিকে, এই চুক্তির সমর্থক ও নীতি-নির্ধারকদের একটি অংশের দাবি—আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের তীব্র অস্থিরতা, নিরাপদ সরবরাহ ব্যবস্থা (Supply Chain), দূরপাল্লার পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যয় এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে শুধুমাত্র প্রাথমিক আর্থিক হিসাবের ভিত্তিতে এই চুক্তির একতরফা মূল্যায়ন করা যথাযথ হবে না।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এই চুক্তি নিয়ে তীব্র তোলপাড় চললেও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ, জ্বালানি মন্ত্রণালয় কিংবা চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বিস্তারিত বা আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আসেনি। সরকারের এই রহস্যময় নীরবতার কারণে আলোচনা ও বিতর্কে থাকা আর্থিক হিসাব ও লুণ্ঠনের দাবিগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জ্বালানি খাতের নিরপেক্ষ বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতিতে এর প্রকৃত প্রভাব মূল্যায়নের জন্য চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি, আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মূল্য নির্ধারণের তুলনামূলক পদ্ধতি এবং সরকারি প্রকৃত তথ্য অবিলম্বে জনসম্মুখে প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে চুক্তির বাস্তব অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে দেশের মানুষের বিভ্রান্তি কাটবে এবং প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
