ড. জেবউননেছা
অধ্যাপক
লোক প্রশাসন বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
স্মৃতির ভারে নীরবভাবেই দুই দিন আগে পেরিয়ে গেছে শহিদ আসাদের জন্মদিন।
সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলাদেশ রাষ্টের জন্মের পিছনে রয়েছে অনেক ইতিহাস।তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস ১৯৬৯ সালের গণ গণঅভ্যুত্থান। এর প্রধান কারণ ছিল আইয়ুব খান -এর স্বৈরাচারী শাসন,রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য, ৬ দফা ও ছাত্র আন্দোলনের চাপ এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা; এর ফলে আইয়ুব খানের পতন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য বাঙালি নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, যা জনমনে ক্ষোভ তৈরি করে এবং শহীদ আসাদ-এর মতো ছাত্রনেতাদের আত্মাহুতি গণআন্দোলন অগ্নিগর্ভ হয়। এই আন্দোলনের ফলে আইয়ুব খানের পতন ও সামরিক শাসনের অবসান ঘটে।আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দীর মুক্তিলাভ করেন
প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার ও সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি স্থাপন হয়, যা ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আন্দোলনের সময় ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারী আসাদুজ্জামান আসাদ গুলিস্তানে শহিদ হন। ২০ জানুয়ারি শহিদ আসাদ দিবসে শহিদ আসাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং সেই সাথে ১৯৬৯ সালের গণ অভুথানের শহীদ আসাদ হত্যা মামলার অন্যতম জীবিত সাক্ষি বীর মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হকের গল্প পরবর্তী প্রজন্মকে জানানোর দায়বদ্ধতা থেকে বর্ননা করছি।কারণ নতুন প্রজন্মের জানা দরকার তাদের গর্বিত পূর্বসুরীদের গল্প।যে গল্প তাদের প্রাণিত করবে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে।যাক গল্পে ফিরে আসি।
পুরান ঢাকার বেগমবাজারের বাসিন্দা আমার বাবার আপন মামাত ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ১৯৬৯ সালে শহীদ আসাদ হত্যা মামলার একমাত্র জীবিত স্বাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রদ্ধেয় এনামুল হক চাচ্চু ,যার সামনে শহীদ আসাদ মৃত্যু বরন করলে তিনি আসাদের মাথাটা কোলের মধ্যে নেন এবং পকেটে রাখা রুমাল দিয়ে রক্ত মুছেন,তিনি এবং তৈয়বা আহমেদ তরু।অই আন্দোলনে চাচ্চু ছিলেন মিছিলের অগ্রভাগে। আসাদের রক্তমাখা রুমাল অনেকদিন চাচ্চুর কাছে সংরক্ষিত ছিল।
চাচ্চু ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনের কর্মী হিসেবে কার্জন হলে তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী হাসান আসকারির গাড়ি বোমা মেরে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন,ছিলেন ১৯৬৬ সালের ছয়দফার একনিষ্ঠ সমর্থক ও কর্মী
২৬ মার্চ,১৯৭১ এ পাকিরা পতাকা নামিয়ে ফেলার নির্দেশ দিলে চাচ্চু বেগমবাজারে তাদের দোতলা বাড়ি থেকে পতাকা অনিচ্ছাকৃতভাবে নামালেও,তিনি পাকিস্তানের পতাকার এক কোণা পুড়িয়ে দেন,এরপর পতাকা টাঙ্গান।১৯৭১ এর বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সমিতির সদস্য,রূপান্তরের গানের শিল্পী,স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গীত শিল্পী।১৯৭১ এ সত্যেন সেন গল্প বলতেন তিনি লিখতেন,কারণ সত্যেন সেন চোখে দেখতে পেতেননা।।ঋত্তিক ঘটক ছিলেন চাচ্চুর কাছের একজন। তিনি সূর্যসেনের সংগ্রামী সাথী চট্রগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের কর্মী কল্পনা যোশীর বাসায় চাচ্চুকে নিয়ে যান।সেখানে চাচ্চুরা একটি করে গান শোনান,আর কল্পনা যোশী স্মৃতি চারন করেন,কি করে অস্ত্রাগার লুন্ঠন করেছেন।
১৯৭১ এ ভারতে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হলে সাতদিন তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্র নিজে চাচ্চুর সেবা করেন।এরপর সুস্থ না হওয়ায় কলকাতার পিজি হাসপাতালে ইলা মিত্রের স্বামী রনেন মিত্র এনামুল চাচ্চুকে ভর্তি করান,সেখানে ২৭ দিন থাকেন।
তিনি ছিলেন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় এবং উদীচি শিল্পী গোষ্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য,নাটক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে থিয়েটার ওয়ার্কসপ করেন বাংলাদেশ মহিলা সমিতিতে,যেখানে প্রশিক্ষন প্রদান করেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগত একজন থিয়েটার বিশেষজ্ঞ টম ইভান্সের কাছ থেকে সফলভাবে ওয়ার্কশপ সম্পন্ন করায় সনদপ্রাপ্ত হন ১৯৭৪ সালে। চাচ্চু ষাট দশকে রেডিও পাকিস্তানের একজন উপস্থাপক ছিলেন।
অথচ,তিনি একজন নিভৃতচারী প্রচারবিমুখ। উদীচি শিল্পী গোষ্টি আজীবন সদস্যপদ দিতে চাইলেও তিনি নিতে চাননি।
তিনি,তার ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল হক চাচ্চু দুজনেই অসম্ভব সাহসী মুক্তিযোদ্ধা।বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল হক ঢাকার উর্দু স্কুল বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। অথচ এই প্রচারের যুগে এই দুইভাই নিভৃতচারী হয়ে আছেন।তারা প্রচার তো দূরের কথা,কৃতিত্ব নেয়ার ধারের কাছে নেই,৭০ দশকে পুরান ঢাকার বেগমবাজারে চাচ্চুদের বাড়িতে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের কর্মীদের নিয়মিত আসা যাওয়া ছিল।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ঠিক সাথে বাড়ি হওয়ায় ১৯৭১ এ কেন্দ্রীয় কারাগারের বহু বন্দুক,রাইফেল তাদের বাড়ি ফেলে যায় কারা রক্ষিরা।এনামুল চাচ্চু,নুরুল চাচ্চু এই অস্ত্র সরবরাহ করতেন মুক্তিযোদ্ধাদের,এমনকি তার ছোট ভাই শামসুল চাচ্চুও সাহায্য করতেন এই কাজে।
এই এত এত ইতিহাস যাদের,যারা বাংলাদেশ জন্মের একজন জ্বলন্ত সাক্ষি।তাদের গল্প জানিয়ে দেয়ার দায়িত্ব আমি একজন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অনুসন্ধানী হিসেবে দায়িত্ব মনে করি।। এনামুল হক চাচ্চু ঢাকার নাট্য জগতে একজন প্রবীন সদস্য।ঢাকা ক্লাবের তিন তিনবার কার্য নির্বাহী পরিষদের নির্বাচিত সদস্য।
সব ছাপিয়ে আমি দারুনভাবে গর্বিত ও বিস্মিত আমার চাচ্চু ১৯৬৯ সালের গণ অভুত্থানের শহীদ আসাদ হত্যা মামলার দুজন সাক্ষির একজন সাক্ষি।।
আশি দশকে আমার বাবা ষাট দশকের কবি ও নাট্যকার মু: জালাল উদ্দিন নলুয়ার লেখা “টাকার পাহাড় চাই’ নাটকের একটি সংলাপ ছিল এরকম, ” “জন্মদাতা,কর্মদাতা,শিক্ষাদাতার মতই আমি ভালবাসি,শ্রদ্ধা করি দেশের মুক্তিদাতা,মুক্তিযোদ্ধাদের “। এই সংলাপটি সেই শৈশব থেকে শুনে বড় হয়েছি বলে বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশ আমার কাছে ভীষণ মূল্যবান সম্পদ। এই দেশ মাটিকে রক্ষা করার পবিত্র দায়িত্ব আমাদের সকলের।।কবি শামসুর রাহমান আসাদের রক্তাক্ত শার্ট দেখে লিখেছিলেন ” “আসাদের শার্ট’ শিরোনামে কবিতা, যারা শেষ চরণ ছিল এমন ‘আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক/
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।”হ্যাঁ আমিও কবির সাথে একমত হয়ে বলতে চাই স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও আসাদের শার্ট আমাদের প্রাণের পতাকার প্রতীক হয়ে আছে।
শহিদ আসাদের এই ঋণ কখনোই শোধ হবার নয়।যাদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। আমরা তাদের কখনোই ভুলবনা।কখনোই না।
