আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির বুকে খোদাই করা হলো আরও এক বাংলাদেশি বীরের নাম। সিটির ব্রঙ্কস এলাকায় কর্তব্যরত অবস্থায় এক নৃশংস বন্দুক হামলায় নিহত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এনওয়াইপিডি (NYPD) কর্মকর্তা দিদারুল ইসলামের স্মৃতি ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে তাঁর নামে একটি সড়কের আনুষ্ঠানিক নামফলক উন্মোচন করা হয়েছে। আজ শনিবার ব্রঙ্কসের ইস্ট ১৭২ স্ট্রিটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের নতুন নামকরণ করা হয় “ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে” (Detective Didarul Islam Way)। অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে দিদারুল ইসলামের শোকসন্তপ্ত পরিবার, নিউইয়র্ক সিটির নির্বাচিত শীর্ষস্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এনওয়াইপিডির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা, বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ এবং শত শত স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার সন্তান দিদারুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের পর প্রথমে নিউইয়র্ক সিটির স্কুল সেফটি এজেন্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে মেধা ও নিষ্ঠার জোরে তিনি আমেরিকার অন্যতম প্রভাবশালী পুলিশ বাহিনী এনওয়াইপিডিতে যোগ দেন এবং ব্রঙ্কসের ৪৭তম প্রিসিঙ্কটে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সহকর্মীদের কাছে তিনি একজন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান, বিনয়ী এবং জনসেবায় নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই ম্যানহাটনের ৩৪৫ পার্ক অ্যাভিনিউ ভবনে সংঘটিত এক ভয়াবহ প্রাণঘাতী বন্দুক হামলায় ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে দায়িত্ব পালনকালে হামলাকারীর গুলিতে তিনি ঘটনাস্থলেই নির্মমভাবে নিহত হন। ওই হামলায় দিদারুল ছাড়াও আরও তিনজন প্রাণ হারিয়েছিলেন। তখন নিউইয়র্কের মেয়র এরিক অ্যাডামস এবং পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ দিদারুল ইসলামকে অনন্য সাহসী ও আত্মত্যাগী কর্মকর্তা হিসেবে স্যালুট জানান।
দিদারুলের এই অকাল ও বীরত্বপূর্ণ মৃত্যুর পর হাজারো পুলিশ কর্মকর্তা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। তাঁর এই অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ এনওয়াইপিডি তাঁকে মরণোত্তর “ডিটেকটিভ ফার্স্ট গ্রেড” পদে বিরল পদোন্নতি দেয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তাঁর স্ত্রী, দুই সন্তান এবং তখন গর্ভে থাকা তৃতীয় সন্তানকে রেখে না ফেরার দেশে চলে যান।
সড়কের নতুন নামফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আবেগঘন বক্তব্য রাখতে গিয়ে বক্তারা বলেন, “ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে” শুধু একজন সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তার স্মৃতিচিহ্ন নয়; এটি নিউইয়র্কের মূলধারায় বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির বিশাল অবদান, জনসেবার প্রতি সর্বোচ্চ অঙ্গীকার এবং আত্মত্যাগের এক অনন্য ঐতিহাসিক প্রতীক, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুগ যুগ ধরে অনুপ্রাণিত করবে। আমেরিকার বিখ্যাত নাগরিক অধিকারবিষয়ক সংগঠন ‘সিএআইআর-নিউইয়র্ক’ (CAIR-NY) এই ঐতিহাসিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, দিদারুল ইসলামের বীরত্ব ও জনসেবার এই চিরস্থায়ী স্বীকৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রবাসীদের গৌরব উজ্জ্বল করবে।
উল্লেখ্য, দিদারুল ইসলামের স্মৃতিকে ধরে রাখতে নিউইয়র্ক প্রশাসনে এর আগেও বেশ কিছু বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মার্কিন আইনসভায় তাঁর নামে “Didarul Islam Police Recruitment Act” শীর্ষক একটি বিশেষ আইন পাসের প্রস্তাবও আনা হয়েছে। এই আইনের মূল লক্ষ্য হলো—স্কুল সেফটি এজেন্টসহ অন্যান্য জননিরাপত্তা পদে কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতাকে এনওয়াইপিডিতে সরাসরি যোগদানের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার ও স্বীকৃতি দেওয়া। আইনপ্রণেতাদের ভাষ্য, এই আইনি সংস্কার দিদারুল ইসলামের কর্মজীবন ও জনসেবার আদর্শকে আমেরিকার মাটিতে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে।
