নিজস্ব প্রতিনিধি : ভোরের ঢাকা কিংবা রাতের ঢাকা নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে দিনের ঢাকাও এখন ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকপাড়া, বাসার গলি, শপিংমল কিংবা বিনোদনকেন্দ্র—সবখানেই সুযোগ বুঝে সাধারণ মানুষের সর্বস্ব ছিনিয়ে নিচ্ছে দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী চক্র।
বাধা দিলে প্রাণঘাতী অস্ত্র বা গুলি চালাতেও দ্বিধা করছে না অপরাধীরা, যার ফলে চরম এক অজানা আতঙ্ক বুকে নিয়ে পথ চলতে হচ্ছে নগরবাসীকে। সম্প্রতি মতিঝিলের শাপলা চত্বরে প্রকাশ্য দিবালোকে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে টাকা ও ডলার লুটের পর নড়েচড়ে বসেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
মতিঝিলের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর ডিএমপি সদর দফতর থেকে রাজধানীর প্রতিটি থানায় কড়া বার্তা পাঠানো হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও চেকপোস্ট বাড়ানোর পাশাপাশি তালিকাভুক্ত ও জামিনে থাকা দাগি ছিনতাইকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে ডিএমপির আটটি বিভাগে তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৩৮৭ জন ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে, যা গত ছয় মাসের তুলনায় প্রায় দেড় গুণ বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওয়ারীতে ৩০৮, তেজগাঁওয়ে ২৪০, উত্তরায় ২৪০, মতিঝিলে ১৬৮, লালবাগে ১৫৯, রমনায় ১৫২, গুলশানে ৬৭ এবং মিরপুরে ৫৩ জন তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী তৎপর রয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অপরাধীদের প্রায় ৮০ শতাংশই একাধিক মামলার আসামি হলেও আইনি ও প্রক্রিয়াগত টালবাহানার সুযোগে জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই অপরাধে জড়াচ্ছে। এছাড়া তালিকাভুক্তদের বাইরেও ছুরি, চাপাতি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হাজার খানেক ভাসমান ও মাদকাসক্ত কিশোর অপরাধী রাজধানীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, রাজধানীতে তিন শতাধিক ছিনতাই স্পটের মধ্যে ৫৫টিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত তিন মাসে রাজধানীতে ৮৩টি নথিভুক্ত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে মার্চ ও এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে অপরাধের গ্রাফ ছিল উর্ধ্বমুখী।
এদিকে পুলিশের শীর্ষ মহল থেকে সহজে মামলা নেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও মাঠপর্যায়ের থানাগুলোতে ভুক্তভোগীদের হয়রানির পুরোনো সংস্কৃতি এখনো বদলায়নি। গত ৯ এপ্রিল মতিঝিলে এক ব্যাংক কর্মকর্তার কাছ থেকে পিস্তল ঠেকিয়ে দেড় লাখের বেশি টাকা লুটের পর মামলা করতেই ভুক্তভোগীর সময় লেগেছে প্রায় এক মাস।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ছিনতাইয়ের পর পুলিশকে তাৎক্ষণিক জানালেও সহযোগিতা মেলে না এবং থানায় গেলে সিসিটিভি ফুটেজ থাকার পরও নানা অজুহাতে মামলা নিতে অনীহা দেখানো হয়। এমনকি মামলায় অস্ত্রের উল্লেখ করতেও বাধা দেয় থানা পুলিশ।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম জানান, ছিনতাইসহ যেকোনো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। জামিনে থাকা অপরাধীদের নজরদারিতে রাখার পাশাপাশি দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
