ড. জেবউননেছা,অধ্যাপক ,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
৩৯ বছর আগে আমার নবম জন্মদিনে আব্বুর বন্ধু কবি ও চিত্রশিল্পী এ.টি. এম শফিকুর রহমান চাচ্চু আমাকে একটি দিনলিপি উপহার প্রদান করেছিলেন। সেই ডায়েরিতে ৩৯ বছর ধরে আমি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অটোগ্রাফ নেই। সেই অটোগ্রাফের ডায়েরিতে ১৯.০৪.২০০৬ইং তারিখে পপ সম্রাট, অভিনেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা আযম খান আমাকে একটি অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন,সেখানে লিখেছিলেন,’জেবা সুন্দর পৃথিবীতে সুন্দর মন নিয়ে বেঁচে থেকো।”
০৫ জুন,২০২৬ এ সকালে ৬.৪১ মিনিটে আব্বু আমাকে ফোনে জানান,আজ আযম খানের মৃত্যুদিবস। তোমার অটোগ্রাফের ডায়েরিতে আযম খানের অটোগ্রাফ আছে। তুমি সামাজিক মাধ্যমে দিও। আমি বললাম,হঠাৎ উনাকে নিয়ে লিখতে বলছ? আব্বু জানালেন,’আযম খান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি এক হাতে অস্ত্র ধরেছেন,আর এক হাতে গানের মাইক ধরেছেন। আমি বললাম,আযম খান সম্পর্কে কিছু বলো,আব্বু , বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কবিতার পংক্তি বললেন, “মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর এক হাতে রণতূর্য’। আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। ১৯৭১ এ বীরোচিত ভূমিকা রেখেছেন পপসম্রাট আজম খান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জীবনকে বাজি রেখে অংশ নিয়েছেন অসংখ্য গেরিলা যুদ্ধে। প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার মেলাঘরে। প্রশিক্ষণ শেষে দেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেন দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে। অস্ত্র হাতে প্রথম লড়াই করেন কুমিল্লার সালদাহে। এরপর ঢাকার ডেমরা, যাত্রাবাড়ী হয়ে লক্ষানদী, বালুনদী, গুলশান, ইসাপুর ও ক্যন্টনমেন্টের পাশ পর্যন্ত নানা স্থানে অংশ নিয়েছেন গেরিলা অপারেশনে। যুদ্ধকালীন সময় ডেমরার তিতাস মিশন শেষ করে ফেরার পথে নৌকাডুবিতে বিপর্যয়ে পড়েন তিনি। নদীর তলদেশের লতায় পা আটকে যাবার ফলে সাঁতার কাটা দুরহ হয়ে পরে। অস্ত্র টানার নৌকা জড়িয়ে ধরে আত্নরক্ষা করেন তিনি।
মতিঝিলে একদিন হাঁটাপথে আব্বুর সাথে আযম খানের দেখা হয়। তারা একে অপরে সালাম বিনিময় করেন। আযম খান আর আব্বুর বয়স একই । আব্বুকে বললাম,আযম খানের গান সম্পর্কে বলো। আব্বু বললেন,”পপ গায়কদের মধ্যে তাকে ব্যতিক্রম লাগে।গানের সময় নানানভাবে অংগভংগি করতেন,যেটি আকর্ষণীয় লাগে ভীষণ। “আব্বু উনার গানের একটি লাইন বললেন,”ওরে সালেকা,ওরে মালেকা, গানের লাইনের কথা। আব্বু আশি দশকে একটি নাটক লিখেছিলেন,নাটকটির নাম ছিল,”টাকার পাহাড় চাই’ । সে নাটকের সংলাপ ছিল,’ এরকম,”জন্মদাতা,কর্মদাতা,শিক্ষাদাতা,মুক্তিদাতার মতই আমি ভালবাসি,শ্রদ্ধা করি মুক্তিদাতা,মুক্তিযোদ্ধাদের।’এই সংলাপটি ধারণ করে বড় হয়েছি আমি। যাই হউক,এরপর আমার একজন অনুজকে বললাম,আযম খান সম্পর্কে বলেন,সে বলল,উনি একজন গায়ক।এর বেশি কিছু জানিনা। আমি হালকা ধাক্কা খেয়ে সামাল দিলাম। এরপর মনে হলো,আযম খান সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মকে বলার চেষ্টা করি।
আসলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এরপরের প্রজন্ম যাদের আমরা জেন জি বলি। তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব অনেক। এখনকার বেশিরভাগ প্রজন্ম সারাক্ষণ ইউটিউব, সামাজিক মাধ্যম,ইনষ্ট্রাগ্রাম,নেটফ্লিক্স,চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে এন্ড্রয়েড ফোনে বুঁদ হয়ে থাকে। সাথে সাথে ত গেমস নামক অনলাইনে লড়াই লড়াই খেলা, পড়ার টেবিলে গাদা গাদা বই,ব্যাগ ভর্তি করে স্কুলে যাওয়া, স্কুল থেকে ফিরে পুনরায় কোচিং। অত:পর গৃহ শিক্ষক, অবসর সময়ে এন্ড্রয়েড ফোনে আসক্ত হয়ে খেলার মাঠ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে কাবাডি,ফুটবল,হাডুডু,নৌকা বাইচের মত খেলা। হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাস পাঠ করার আগ্রহ। সামনে বিশ্বকাপ ফুটবল। এই নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যার যার পছন্দের দলের জার্সি পরে সামাজিক মাধ্যমে ছবি দেয়ার প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে আমাদের স্বকীয়তা হারাই।
কেউ কেউ এই সুযোগে তাদের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নিজের মত করে ইতিহাস তৈরী করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করছে। এদিকে নতুন প্রজন্ম কোন রকম বাছ বিচার না করেই বিশ্বাস করে নিজেদের সেই পথে পরিচালিত করছে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে যে দেশটি জন্মলাভ করেছিল তার ক্রীড়ানক ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ। কিন্ত এমন ও দেখতে হচ্ছে,মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতোর মালা। শত শত মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাঙ্গা হয়েছে। স্বাধীনতার আঁতুড়ঘর ধানমন্ডি ৩২ এর ৬৭৬ নাম্বার বাড়ি ভেঙে ফেলা। এরকম অদ্ভূত সময় কখনো চোখে পড়েনি।গত কয়েক বছরে যা চোখে পড়েছে। তাছাড়াও সামাজিক মাধ্যমে নানান অশ্লীল ভাষার ব্যবহার,সাইবার বুলিং এগুলো যেন সাধারণ ব্যাপার। ওদিকে ৩,০০০ এর ও বেশি শিক্ষক লাঞ্চিত হয়েছেন। অপ্রিয় হলে সত্যি যে,সমাজে পরিমানগত পরিবর্তন অভুতপূর্বভাবে পরিলক্ষিত হলেও গুণগত পরিবর্তনের নাম চিহ্ন পর্যন্ত দেখা যায়না। এহেন দৃষ্টিতে সমাজে নানা শ্রেণির নানা পেশার মানুষ তৈরী হবে ঠিকই। কিন্ত মানবিক মানুষ গড়ে তোলার কাজটি ঘর থেকে শুরু করা জরুরি। পরিবার হতে হবে প্রধান পাঠশালা। কয়দিন আগে রাজধানীর একটি প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র উপভোগ করতে গিয়েছিলাম। চলচ্চিত্রটি শুরুর পূর্বে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় বেশ কয়েকজন দর্শক দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করলনা। বিষয়টি ভীষণ চোখে পড়ল।মাঝে মাঝেই প্রেক্ষাগৃহে এরকম চোখে পড়ে।ছেলেবেলাতেই শিশুদের জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা,দেশের ইতিহাস,সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া জরুরি। আমি নিজের জীবন দিয়ে শিখেছি,শিশুকালে যে বীজ বপন করা হয়,তাই গেঁথে থাকে শিশুর অন্তরে। আমাদের বাড়ির বৈঠকখানায় বড় ফ্রেমের মধ্যে সাত বীরশ্রেষ্ঠ’র ছবি আমার শৈশবে জ্ঞান হবার পর ঝুলে থাকতে দেখতাম। তখন থেকে সাত বীরশ্রেষ্ঠ আমার জীবনের অংশ হয়ে পড়ে। মায়ের লেখা ‘মুজিব চিরঞ্জীব’ কবিতা। নানাবাড়ির দেয়ালে বঙ্গবন্ধুর বড় ছবি,বাসার বইয়ের তাকে মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস সংক্রান্ত বই এবং আমার বাবার লেখা কনিতা,৭১ এর ডায়েরি এগুলো আমাকে ভীষণভাবে ইতিহাস সচেতন করে গড়ে তুলেছে। তারই ধারাবাহিকতায় নিজের সন্তানকে ইতিহাস,মুক্তিযুদ্ধ এবং নানা ধরণের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার সুযোগ করে দিয়েছি। তারই অংশ হিসেবে সে তার সম বয়সীদের সাথে যেটা যৌক্তিক সেটাকে যুক্তি বলে মেনে নেয়। শ্রোতে ঘা ভাসায়না।
এখনকার সময় সামাজিক মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধান শিক্ষক হিসেবে। এখানে যা বলা হয় সেটাকেই সত্যি বলে ধরা হয়।
এখন ইতিহাসকে মনে হয় কাঁচের পুতুলের মত চাইলেই ভেঙে ফেলা যায়। গতকাল দুইদিন সামাজিক মাধ্যমে চোখ রেখেছি এজন্য যে,বীর মুক্তিযোদ্ধা,পপ সম্রাট আযম খানের প্রয়ান দিবস নিয়ে কেউ কিছু লিখেন কিনা। কিন্ত না আমার চোখে পড়েনি।অথচ আব্বু মনে করিয়ে দিলেন। প্রজন্মের ব্যবধান এটাই।
আমাদের মনে হয় আরও সতর্ক হওয়া দরকার। আমাদের বাচ্চাগুলোর হাতে বই দেয়া দরকার।তাদেরকে বলা দরকার ইতিহাস থেকে শিখে নাও।তাদের বলা দরকার সামাজিক মাধ্যমে সাবধানে আদব বজায় রেখে কথা বলবে। কারণ এই মাধ্যমটি এখন অনেকটা তোমার ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম।
বাচ্চাদের সময় দিন,ফুল পাখি পশুর সান্নিধ্যে দিন। সমুদ্র, পাহাড় দেখতে নিয়ে যান। সারাদিন পড়ো, পড়ো করে তাকে জ্ঞানের জাহাজ বানানো যাবে।কিন্ত প্রকৃত মানুষ হিসেবে বড় করতে গেলে শ্রম দিতে হবে। আজকের শিশু আগামি দিনের ভবিষ্যতের কান্ডারী।
যাই হউক,বীর মুক্তিযোদ্ধা আযম খানের মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই শ্রদ্ধা ও সালাম। আর একটি কথা বলা হয়নি,আমরা সবাই তাকে আযম খান নামে চিনলেও তার প্রকৃত নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মোহাম্মদ মাহবুবুল হক,আযম খানের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এজন্য যে,জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে আমাদেরকে একটি লাল সবুজের পতাকা উপহার দিয়েছিলেন বলে। সেই সাথে সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। জাতির সূর্য সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মাহবুবুল হক এবং বাংলাদেশের সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিবেদন করে লেখাটির ইতি টানছি,”রক্তরাঙা একাত্তরের সেই দিনগুলোতে/মাথার ওপর মৃত্যু নিয়ে নেমেছিলে রণাঙ্গনে। তোমাদের অসীম সাহসে আর বজ্রকঠিন প্রতিজ্ঞায়/ভেঙে চুরমার হয়েছিল হায়েনার কালো কারাগারে/বুকে ছিল লাল-সবুজ স্বপ্নের এক তীব্র নেশা/পায়ের নিচে কেঁপে উঠেছিল পাক হানাদার/তোমরা দিয়েছো রক্ত, এনেছো মুক্তির ভোর/তোমাদের ত্যাগে আজ হাসে বাংলার কিশোর/আজকের এই শান্ত আকাশ, সবুজ ফসলের মাঠ/তোমাদেরই দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার, বীর মুক্তিযোদ্ধা/আমরা ভুলিনি, ভুলবো না কোনোদিন তোমাদের ঋণ/তোমরা আমাদের অহংকার, আমাদের চিরদিন।
