একটার পর একটা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ধাক্কায় পর্বতসম সংকট নিয়ে চলা বর্তমান সরকারের বিপদ যেন কোনোভাবেই কাটছে না। কোনোটি প্রাকৃতিক, কোনোটি বৈশ্বিক আবার কোনোটি নিজস্ব অব্যবস্থাপনার কারণে সৃষ্ট—এমন বহুমুখী সংকটের জাঁতাকলে পড়ে দেশের সাধারণ মানুষের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই শুরু হওয়া আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। বৈশ্বিক এই ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দেশের বাজারেও পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিনসহ বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয়েছে; যার ফলে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেয়ে চাল, ডাল, তেলসহ প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
অর্থনৈতিক এই চরম কশাঘাতের মধ্যেই দেশে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয়। গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৬১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার পেছনে টিকা কেনায় উদাসীনতাকে দায়ী করছেন অনেকে। হামের এই ভয়াবহতার সমান্তরালে এখন নতুন আতঙ্ক হিসেবে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু, যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটায় জনমনে তীব্র সামাজিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নির্যাতন, জ্যামিতিক হারে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের ঘটনা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সামান্য মোবাইল বা টাকার জন্য খোদ রাজধানীতেই ছিনতাইকারীদের হাতে অনায়াসে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতেও কোনো সুখবর নেই, উল্টো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে খেলাপি ঋণ। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই খেলাপি ঋণ ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বেড়ে মোট শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮,৭০৪ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া শূন্যতা, ডলারসংকট ও ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে শিল্পকারখানা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় থাকা ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছেন।
বিপজ্জনক এই পরিস্থিতির মাঝে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জটিলতায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলমান ৫.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের শেষ দুই কিস্তি ছাড় করছে না এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) কাছে চাওয়া ১ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা থেকেও সাড়া মিলছে না। অথচ আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শুধু অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের লক্ষ্যই নির্ধারণ করতে হচ্ছে ১ লাখ ২৭,৫০০ কোটি টাকা।
চতুর্মুখী এই সংকটের মধ্যেই দেশের সীমান্ত এলাকায় নতুন উত্তেজনা যোগ করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইনের অপচেষ্টা। গত কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে মানুষ ঠেলে পাঠানোর এই তৎপরতা অবশ্য কঠোরভাবে ঠেকিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থি যেকোনো প্রচেষ্টা রুখে দিতে বর্তমানে সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ গোয়েন্দা নজরদারিসহ টহল জোরদার করা হয়েছে।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
