নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর মিরপুরে সমাজের তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানদের চরম মানবিক অবক্ষয় ও নিষ্ঠুর অবহেলার এক নির্মম চিত্র সামনে এসেছে।
মিরপুর-৬ নম্বর সেকশনের একটি ফ্ল্যাট থেকে নুরজাহান বেগম (৭২) নামের এক বৃদ্ধা মায়ের পচাগলা ও পোকা ধরা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত রবিবার (৩১ মে) রাতে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বরে কল পেয়ে মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের ১২ নম্বর রোডের একটি ফ্ল্যাট থেকে ওই মরদেহ উদ্ধার করে পল্লবী থানা পুলিশ।
প্রাথমিক সুরতহাল শেষে পুলিশের ধারণা, উদ্ধারের অন্তত সাত থেকে আট দিন আগেই ওই বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ কক্ষে পড়ে থাকায় মরদেহটিতে মারাত্মকভাবে পচন ধরেছিল এবং পোকা চলে এসেছিল।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির জানান, মৃত নুরজাহান বেগম মিরপুরের ওই ফ্ল্যাটে তাঁর অবিবাহিত মেয়ের সঙ্গেই থাকতেন। তবে মেয়েটি মায়ের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি কক্ষে বসবাস করতেন। দীর্ঘ বেশ কিছুদিন মায়ের কোনো সাড়াশব্দ বা খোঁজখবর না পেয়ে রবিবার এক নার্সকে ডেকে আনেন ওই মেয়ে। নার্স কক্ষে গিয়ে বৃদ্ধাকে মৃত ও পচাগলা অবস্থায় দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন।
ওসি আরও জানান, “বৃদ্ধার মেয়েকে তাঁর মায়ের মৃত্যুর কারণ ও সময় জিজ্ঞেস করলে তিনি যে উত্তর দিয়েছেন, তা কোনোভাবেই সন্তোষজনক মনে হয়নি। তিনি মায়ের মৃত্যুর সঠিক সময়ও বলতে পারেননি। একটি ফ্ল্যাটে একসঙ্গে থেকেও সাত-আট দিন ধরে মায়ের মৃত্যুর খবর সন্তান জানবে না, এটি রহস্যজনক। তাই মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।”
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৃত নুরজাহান বেগমের স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একজন নামকরা শিক্ষক ছিলেন, যিনি প্রায় পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, বৃদ্ধা যে কক্ষটিতে থাকতেন, সেটি ছিল অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন, অগোছালো এবং আবর্জনায় ভরা। কক্ষের ভেতরের কঙ্কালসার পরিবেশ দেখে স্পষ্ট বোঝা গেছে যে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি চরম অবহেলা, পুষ্টিহীনতা ও চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছিলেন।
একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মৃত নুরজাহান বেগমের তিন ছেলেই সমাজে অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত এবং উচ্চপদস্থ। তাঁদের একজন সরকারের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, একজন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং অন্যজন প্রবাসী, যিনি কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তবে তাঁরা কেউ মায়ের সাথে থাকতেন না এবং আলাদা আলিশান বাসায় নাগরিক জীবনযাপন করতেন। মায়ের এমন করুণ মৃত্যুর খবর সন্তানদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অজানা।
এই ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) ডায়েরি করা হয়েছে। এটি কেবল একটি স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি এর পেছনে কোনো হত্যাকাণ্ড বা আত্মহত্যা প্ররোচনার মতো অপরাধ লুকিয়ে রয়েছে, তা উদঘাটনে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ। তবে এই ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সুশীল সমাজে তীব্র ধিক্কার ও ক্ষোভের ঝড় উঠেছে।
